রোববার   ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ১৯ ১৪৩২   ১৩ শা'বান ১৪৪৭

ডিজিটাল লেনদেনে রেড অ্যালার্ট: ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কড়াকড়ি

তরুণকণ্ঠ অনলাইন

প্রকাশিত : ০৪:২০ পিএম, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রোববার

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটের মাঠে টাকার অবৈধ প্রভাব বিস্তার ঠেকাতে ডিজিটাল লেনদেনে বড় ধরনের লাগাম টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ছয় দিন বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং সব ধরনের ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবায় বিশেষ কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই ছয় দিন একজন গ্রাহক দিনে সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করতে পারবেন। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে একক লেনদেনের সীমার ক্ষেত্রে; প্রতিবার লেনদেনে এক হাজার টাকার বেশি পাঠানো যাবে না। অর্থাৎ, বড় অঙ্কের টাকা ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তর করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।

 

শুধু মোবাইল ব্যাংকিং নয়, একই সময়ে ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেনও কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসছে। ব্র্যাক ব্যাংকের ‘আস্থা’, সিটি ব্যাংকের ‘সিটিটাচ’ কিংবা ডাচ-বাংলার ‘নেক্সাস পে’-এর মতো জনপ্রিয় অ্যাপগুলো ব্যবহার করে ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে (P2P) টাকা পাঠানোর সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন কমিশনের বিশেষ অনুরোধেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ভোটারদের প্রভাবিত করতে বড় অঙ্কের ডিজিটাল ট্রানজেকশন যাতে ব্যবহৃত হতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করাই এই ‘রেড অ্যালার্ট’-এর মূল লক্ষ্য।

 

এরই মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকা উত্তোলন ও জমার ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেছে বিএফআইইউ। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক হিসাবে এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি লেনদেন হলে তা তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে জানাতে হবে। তথ্যে কোনো লুকোছাপা বা অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের বরাতে জানা গেছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে শিগগিরই একটি আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে লেনদেনের এই সীমা আরও বাড়ানো বা কমানোর এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংরক্ষণ করবে বলেও জানানো হয়েছে।

 

বর্তমানে এমএফএস সেবা ব্যবহার করে একজন গ্রাহক দিনে যেখানে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত লেনদেন করতে পারেন, সেখানে হঠাৎ এই কড়াকড়ি সাধারণ গ্রাহক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজনে টাকার প্রয়োজন হলে গ্রাহকরা সংকটে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

তবে বিএফআইইউ মনে করছে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে সাময়িক এই ভোগান্তি মেনে নেওয়া প্রয়োজন। তারা মনে করেন, ডিজিটাল লেনদেনের ট্র্যাকিং সহজ হওয়ায় এই কড়াকড়ি অর্থের অপব্যবহার কমিয়ে আনতে বড় ভূমিকা রাখবে।

 

ব্যবসায়িক মহলে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন, নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে লেনদেন সীমিত করায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ চেইন বা ছোট ব্যবসায়িক লেনদেন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা একে একটি সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

 

উল্লেখ্য যে, এর আগে কোনো নির্বাচনে ডিজিটাল লেনদেনে এমন ব্যাপক মাত্রায় কড়াকড়ি দেখা যায়নি। ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এই প্রথম কোনো রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে অনলাইন আর্থিক গতিপথকে নজিরবিহীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নেওয়া হলো।

 

সবমিলিয়ে ৮ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি একটি বিশেষ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাবে। সাধারণ মানুষকে এই সময়ের আগে প্রয়োজনীয় আর্থিক কাজ সেরে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা।