জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩: সম্মান নাকি বিতর্কের উৎসব?
মোঃ মোসাদ্দেক হোসাইন ইমন
প্রকাশিত : ০৩:৫৮ পিএম, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রোববার
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার মানেই এক সময়ের পরম আরাধ্য সম্মান, যা একজন শিল্পীর সারা জীবনের সাধনার স্বীকৃতি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই রাষ্ট্রীয় পুরস্কারকে ঘিরে বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। ২৯ জানুয়ারি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষিত ২০২৩ সালের পুরস্কারের তালিকাটি সেই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
এবারের আসরে সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে জুরিবোর্ডের গঠন ও তাদের মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে। কোন মানদণ্ডে সিনেমাগুলো বাছাই করা হয়েছে, তা নিয়ে খোদ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। ফলে পুরস্কার ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে এফডিসি পাড়ায় বইছে সমালোচনার ঝড়।
২০২৩ সালের সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যবসাসফল সিনেমা ছিল ‘প্রিয়তমা’। অথচ এই দর্শকনন্দিত সিনেমা এবং এর মুখ্য অভিনেতা শাকিব খানকে কেন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হলো, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। শাকিব খান এই সিনেমায় তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অভিনয় করা সত্ত্বেও জুরিবোর্ডের সুনজরে না আসাটা রহস্যজনক বলে মনে করছেন বোদ্ধারা।
অন্যদিকে, ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমার জন্য আফরান নিশো সেরা অভিনেতা নির্বাচিত হলেও অনেকের মতে, শাকিব খানকে অন্তত বিবেচনায় রাখা উচিত ছিল। এতে বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমার লগ্নিকারকরা উৎসাহিত হতেন। প্রিয়তমার মতো ব্যবসাসফল সিনেমাকে বাদ দেওয়ায় রাষ্ট্রীয় এই পুরস্কারের জৌলুস অনেকখানি ম্লান হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে নজিরবিহীন বিতর্ক তৈরি হয়েছে ‘রক্তজবা’ সিনেমাটিকে কেন্দ্র করে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি না পেলে কোনো সিনেমা জাতীয় পুরস্কারের জন্য যোগ্য হবে না। অথচ কেবল ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটি কোন ম্যাজিকে সেরা চিত্রনাট্যের পুরস্কার পেল, সেই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর নেই।
বিস্ময়ের এখানেই শেষ নয়; চিত্রনাট্যের জন্য মনোনীত করা হয়েছে পরিচালক নিয়ামুল মুক্তাকে। অথচ তিনি নিজেই জানিয়েছেন, এই সিনেমার চিত্রনাট্য তিনি লেখেননি। একজন পরিচালক যে কাজের জন্য কৃতিত্ব দাবি করেননি, জুরিবোর্ড তাঁকে সেই পুরস্কারের জন্য কীভাবে মনোনীত করল, তা জুরিবোর্ডের অযোগ্যতাকেই সামনে এনেছে।
নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত না হয়ে পরিচালক নিয়ামুল মুক্তা ইতোমধ্যেই এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, যে কাজ তিনি করেননি এবং যে সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি, তার জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মান নেবেন না। তাঁর এই সাহসী অবস্থান জুরিবোর্ডকে চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে।
সংগীত বিভাগেও এবার অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ‘ও প্রিয়তমা’ গানের জন্য কেবল বালামকে সেরা গায়ক নির্বাচিত করা হয়েছে। অথচ গানটিতে তাঁর সঙ্গে সমান গুরুত্বে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সোমনুর মনির কোনাল। দ্বৈত কণ্ঠের গানে একজন শিল্পীকে পুরস্কৃত করা এবং অন্যজনকে ব্রাত্য রাখা নিয়ে সংগীত পাড়ায় চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
একই সিনেমার ‘ঈশ্বর’ গানটির গায়ক রিয়াদের নাম তালিকায় না থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সুরকার প্রিন্স মাহমুদ এবং গীতিকার সোমেস্বর অলি পুরস্কার পেলেও গায়ক রিয়াদকে কেন এড়িয়ে যাওয়া হলো, তা অনেকের কাছেই অস্পষ্ট। নবাগতদের উৎসাহিত করার বদলে এমন উপেক্ষা নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।
পুরস্কারের নীতিমালায় মৃত ব্যক্তিকে বিশেষ কোনো কারণ ছাড়া আজীবন সম্মাননা দেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। অথচ এবার যৌথভাবে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়েছে প্রয়াত তারেক মাসুদ এবং আব্দুল লতিফ বাচ্চুকে। যদিও তাঁরা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি, কিন্তু নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই ঘোষণা আইনি জটিলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
একাধিক সিনিয়র নির্মাতা ও শিল্পী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে জুরিবোর্ডের সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এখন আর নিরপেক্ষ মূল্যায়নের প্রতীক নেই, বরং এটি একটি আনুষ্ঠানিকতা বা ব্যক্তিগত লবিংয়ের প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
শিল্পগুণ বিচারের চেয়ে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রভাব পুরস্কার নির্ধারণে কাজ করেছে কি না—সেই পুরনো সন্দেহ আবারও জোরালো হয়েছে। জুরিবোর্ডের সদস্যদের যোগ্যতা এবং সিনেমা বাছাইয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন নতুন প্রজন্মের নির্মাতারা।
এই ধারাবাহিক বিতর্ক তরুণ ও মেধাবী নির্মাতাদের মনে হতাশা তৈরি করছে। তারা যদি বিশ্বাস করতে না পারে যে যোগ্যতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলবে, তবে সিনেমার মানোন্নয়নে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। এটি দেশের চলচ্চিত্রের দীর্ঘমেয়াদী ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।
এত সব বিতর্ক এবং নজিরবিহীন প্রত্যাখ্যানের পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আসেনি। জুরিবোর্ডের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে এই নীরবতা জল্পনা-কল্পনাকে আরও উসকে দিচ্ছে এবং পুরস্কারের গ্রহণযোগ্যতাকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনছে।
পরিশেষে বলা যায়, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারকে বিতর্কমুক্ত রাখতে হলে জুরিবোর্ড পুনর্গঠন এবং সিলেকশন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ করা জরুরি। অন্যথায়, রাষ্ট্রীয় এই সর্বোচ্চ সম্মানের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও আকাঙ্ক্ষা দুই-ই হারিয়ে যাবে, যা আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য হবে এক অপূরণীয় ক্ষতি।
