শনিবার   ৩১ জানুয়ারি ২০২৬   মাঘ ১৮ ১৪৩২   ১২ শা'বান ১৪৪৭

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে পাখি মেলা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, রাবি

প্রকাশিত : ০৩:২৭ পিএম, ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ শনিবার

যে পাখিগুলোকে আকাশে উড়তে দেখা যায় না, যাদের ডাক হারিয়ে গেছে প্রকৃতির শব্দভাণ্ডার থেকে—তাদেরই দেখা মিলছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) বুদ্ধিজীবী চত্বরে আয়োজিত ব্যতিক্রমী পাখি মেলায়। তবে জীবন্ত নয়, ‘মমি’ হয়ে। রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত এসব পাখির মাধ্যমে বিলুপ্তি আর সংরক্ষণের মাঝের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে এখানে। প্রাণহীন দেহে প্রাণের এই উপস্থিতিই মেলাটিকে করেছে আলাদা ও চিন্তাজাগানিয়া। কাছ থেকে, নির্ভয়ে পাখি দেখার সুযোগ পেয়েছেন দর্শনার্থীরা।

‘পাখি দেখি, পাখি ভালোবাসি, পাখি রক্ষা করি–এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় দিনব্যাপী এই মেলার আয়োজন করা হয়। উদ্বোধনের পর পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে বের করা হয় একটি র‌্যালি। মেলার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ড কনজারভেশন ক্লাব। সার্বিক সহযোগিতায় ছিল প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও বার্ডশাহী ও ভ্যালেন্টটেক লিমিটেড।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সাদা-নীল কাপড়ে ঘেরা পরিপাটি একটি জায়গায় সাজানো হয়েছে কয়েকটি ছোট স্টল। স্টলে প্রদর্শিত ছবির মধ্যে আছে চোখাচোখি, পিজিওন, প্যারোট, নিশি বক, গুবড়ে শালিক, বামুন শালিকসহ নানা প্রজাতির পাখি।

পাশের আরেকটি স্টলে ছিল সংরক্ষিত পাখির প্রদর্শনী। মেলার সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশ ছিল স্কুলশিক্ষার্থীদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। ক্যাম্পাসসংলগ্ন বিভিন্ন স্কুলের নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়।

স্টলে প্রদর্শিত ছবির মধ্যে আছে কালোপিঠ গাংচিল, পালাসির গাংচিল, সাইবেরিয়ান শিলাফিদ্দা, নীল চটক, উইলসন্স স্টর্ম পেট্রল, লালঘাড় কাস্তেচোরা, ইউরেশিয়ান চামচঠুঁটি, বুটপা ঈগল, জল ময়ূর, ডাহুক, বামুন শালিকসহ নানা প্রজাতির পাখি। নামগুলো শুনেই অনেক দর্শনার্থী অবাক হচ্ছিলেন, কেউ কেউ মোবাইলে ছবি তুলে রাখছিলেন স্মৃতি হিসেবে।
পাশের আরেকটি স্টলে ছিল সংরক্ষিত পাখির প্রদর্শনী। সারিবদ্ধভাবে সাজানো পানকৌড়ি, জলকাক, টিয়া, লক্ষ্মী পেঁচা, হুতোম পেঁচা, গরিয়াল মাছরাঙা, নিশি বক, পাতি কাক, কোয়েল, বালি হাঁস, কাঠবিড়ালিসহ বিভিন্ন প্রাণী। কাছ থেকে দেখে অনেকেই বুঝতে পারছিলেন, প্রকৃতিতে এদের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কতটা বাস্তব।

বাবার সঙ্গে মেলায় ঘুরতে ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা শহিদ নজমুল হক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাঈয়িবা আক্তার বলছিল, এখানে এসে খুব ভালো লেগেছে। অনেক নতুন পাখি দেখেছে, যেগুলো আগে কখনো দেখেনি। এমন আয়োজন আরও বেশি হলে ভালো হয় বলে মনে করে সে।

স্টলে দর্শনার্থীদের পাখি সম্পর্কে নানা তথ্য দিচ্ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের ২০২০–২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা আশা। তিনি বলেন, মেলায় এমন অনেক দুর্লভ পাখি রয়েছে, যেগুলো সাধারণত সচরাচর দেখা যায় না। সাদা বক, স্কেলেটন, দুর্লভ হাঁস, পিজিয়নসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে। সকাল থেকেই স্টলে দর্শনার্থীদের ভিড় রয়েছে। তারা কীভাবে এসব পাখি সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং এর পেছনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কী- সে বিষয়ে দর্শনার্থীদের ধারণা দেওয়া হচ্ছে।

মেলায় ট্যাক্সিডার্মি বিষয়ে জানাতে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও আর্মফোর্স মেডিকেল কলেজের গেজেটেড ট্যাক্সিডার্মিস্ট মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণী মারা গিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে দেখে তার মধ্যে সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই ট্যাক্সিডার্মি নিয়ে কাজ শুরু করেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে মূলত দুটি জায়গায় নিয়মিতভাবে এ ধরনের পাখি মেলা আয়োজন করা হয়- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই মেলার মূল উদ্দেশ্য হলো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পাখি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা, তাদের পাখি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেওয়া এবং কীভাবে বৈজ্ঞানিকভাবে পাখি সংরক্ষণ করা হয় তা তুলে ধরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে এই আয়োজন প্রতিবছর নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ড কনজারভেশন ক্লাবের আহ্বায়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক অধ্যাপক ড. এ. এম. সালেহ রেজা বলেন, 'বাংলাদেশে এমন অনেক পাখি আছে যেগুলো সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। এসব পাখিদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করে দিতে, পাখির প্রতি তাদের মমত্ববোধ তৈরি এবং পাখি সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন করতেই আমরা এই মেলার আয়োজন করেছি।'

তিনি আরো বলেন, 'প্রতি বছর শীতের শুরুতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় পুকুর এবং নারকেলবাড়িয়া ক্যাম্পাসে প্রচুর পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে। তাদের সংরক্ষণে আমাদের সচেতন হতে হবে। তাদেরকে যদি আমরা থাকার উপযুক্ত পরিবেশ না দিয়ে ঢিল ছুঁড়ে বিরক্ত করি তাহলে তারা আতঙ্কিত হয়ে অন্যত্র চলে যাবে। পাখিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের রক্ষায় তাদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করা যাবে না।'