অসহায়ত্বের শেষ কথা
আফরিন আক্তার নীলা
প্রকাশিত : ০২:৪০ পিএম, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার
একসময় ফররুখ আহমদ "পাঞ্জেরী"কে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—সূর্য ওঠার কত দেরি? তাঁর কবিতায় পাঞ্জেরী ছিলেন জাহাজের কাণ্ডারি, মুসলিম জাতির পথপ্রদর্শক, যিনি অন্ধকার রাত পার করে আলোর দিকে নিয়ে যাবেন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে (বা যেকোনো দুর্দশাগ্রস্ত সমাজে) সেই অন্ধকার যেন আরও গাঢ় হয়েছে। রাস্তা কাঁদছে, নদী চুপ, মানুষের বুকে ইতিহাসের ভার। এই কবিতাটি সেই পুরনো আকুতিরই এক নতুন রূপ—যেখানে পাঞ্জেরীকে আরও কাছের, আরও মায়াময় করে ডাকা হয়েছে, শুধু সুদিনের জন্য নয়, মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য।
অসহায়ত্বের শেষ কথা
আফরিন আক্তার নীলা
এই অসহায়ত্বের শেষ কথায় দাঁড়িয়ে
আমি পাঞ্জেরীর দিকে তাকাই—তিতাস ফিরছে,
তুমি বলেছিলে সুদিন ফিরবে—এই কথাটা আমি বুকের ভেতর রেখে প্রতিদিন বেঁচে ছিলাম।
কিন্তু এমন কষ্ট,এমন ভয়ংকর হাহাকার পুরো মানচিত্রে দাগ কেটে দেয় পাঞ্জেরী, যেন দেশ নয়—একটা দীর্ঘশ্বাসের শরীর।
রাস্তাগুলো কাঁদে, নদীগুলো চুপচাপ, ঘরগুলো নিঃশ্বাস নেয় ভয় নিয়ে— পাঞ্জেরী, এই দুঃখ কার, বলো তো?
কে এভাবে মানুষের বুকের ওপর ইতিহাস চাপিয়ে দেয়?
পাঞ্জেরী, এইবার চোখের জল ফুরালো।
আর কাঁদার জায়গা নেই— শুধু জমে থাকা নীরবতা।
আমি এক্কান বড় বাক্স কিনে রাখবো, সেখানে রাখবো সব না-পাওয়ার হিসাব, সব মৃত স্বপ্ন, সব হেরে যাওয়া সকাল।
দুঃখকে ভয় দেখাতে দীর্ঘ লাল ফিতা কিনে আনবো, বেঁধে রাখবো যেন সে পালাতে না পারে— যেন আর কাউকে এভাবে গিলে না খায়।
এবারের মতো সুদিন ফিরে আসুক পাঞ্জেরী, আমি বেঁচে থাকার জন্য রোজ খাজনা দেবো— হাসির, সহ্যের, অপমানের, নীরবতার।
চোখের ক্লান্তিতে তুমি কিভাবে ঘুমিয়ে যাচ্ছো পাঞ্জেরী?
তোমার কি একটুও মায়া হয় না?
দেখো, কত চোখ চেয়ে আছে কষ্টের আঁধারে—তারা ঘুমায় না,তারা অপেক্ষা করে।
একটা ভোর কবে ফিরবে পাঞ্জেরী?
আজ শব্দেরা আর্তনাদ করে,তুমি কি শুনতে পাও?
দেখো—এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই,কারো কান্না আলাদা নয়,কারো ক্ষুধা আলাদা নয়।
সবাই একই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে একই আলোর নাম উচ্চারণ করছে।
আজ ধর্ম নয়, কর্ম নয়—পরিচয় শুধু মানুষ।
আজ তারা বুঝিয়ে দিচ্ছে মানুষের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম এই পৃথিবীতে নেই।
আর কতদূর পাঞ্জেরী?
আর কত রাত?
আর কত বুক ফাটলে ভোরের জন্ম হয়?
এবার ভোর আসুক—রক্ত নয়, আলো নিয়ে।
ভয় নয়, শান্তি নিয়ে।মৃত্যু নয়, জীবন নিয়ে।
পাঞ্জেরী—এইবার ফিরো।
