ওমর হাদির লোভ এবং রাষ্ট্রের দায়মুক্তির কৌশল
প্রকাশিত : ১২:১০ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ সোমবার
সফিকুল ইসলাম সবুজ
১৬ জানুয়ারি, শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর বারবার চোখে পড়ছিল— ‘যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে দ্বিতীয় সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ভাই ওমর হাদি।’ প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিইনি। বর্তমান সময়ে ভুয়া খবর, পরিকল্পিত অপপ্রচার আর প্রোপাগান্ডা এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে এমন একটি তথ্যকে সন্দেহ করাই যুক্তিসংগত মনে হয়েছিল। বিশেষ করে, শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে তারই গড়ে তোলা সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চ যখন ধারাবাহিক আন্দোলনে এবং ওই দিনই যখন বাদ জুমা বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল— তখন এই প্রচারণা আন্দোলনকে দুর্বল করার একটি কৌশল হিসেবেই ধরে নেওয়া স্বাভাবিক। আমিও সেই সন্দেহই করেছিলাম।
কিন্তু বাস্তবতা খুব দ্রুত সেই সন্দেহ ভেঙে দেয়। দেশের একাধিক মূলধারার গণমাধ্যমে খবরটি প্রকাশিত হয়। এরপর ইনবক্সে আসে একজন সহকর্মীর পাঠানো সরকারি প্রজ্ঞাপন। তখন আর বিভ্রান্তির সুযোগ থাকল না। ঘটনা সত্য। সেখানেই প্রথমবার সত্যিকার অর্থে থমকে যেতে হয়। মনে হয়, এভাবেও কি একজন মানুষ তার আপন ভাইয়ের রক্তের সঙ্গে আপস করতে পারে?
শহীদ ওসমান হাদির পরিবার সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তারা কোনোভাবেই সুবিধাবঞ্চিত বা অসহায় নন। ভাই-বোনেরা সবাই সুশিক্ষিত, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং আর্থিকভাবে স্বচ্ছল। হাদির জানাজা-পূর্ব সমাবেশে তার বড় ভাই ড. আবু বক্কর সিদ্দিক যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা এখনো অনেকের মনে আছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের কাছে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। একটাই দাবি— এই বাংলার জমিনে হাদি হত্যার বিচার হতে হবে।
এই বক্তব্য কোনো আবেগী উচ্চারণ ছিল না। ছিল একটি নৈতিক অবস্থান। একই অবস্থান আরও জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছিল ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের কণ্ঠে। তিনি বলেছিলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে শহীদ ওসমান হাদির পরিবারের যদি কিছু প্রয়োজন হয়, তা জানাতে। আমি ইনকিলাব মঞ্চ এবং শহীদ শরিফ ওসমান হাদির পরিবারের পক্ষ থেকে বলতে চাই— তাদের কিছু লাগবে না। উল্টো রাষ্ট্রের প্রয়োজনে, গণতন্ত্রের প্রয়োজনে তার ভাই-বোনেরা রক্ত দিতে প্রস্তুত।’
এই কথাগুলো শুধু বক্তব্য নয়, এক ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক ঘোষণা ছিল। এই ঘোষণার মধ্যেই নিহিত ছিল আন্দোলনের শক্তি, ন্যায়বিচারের দাবি এবং রাষ্ট্রের প্রতি একটি স্পষ্ট বার্তা— বিচারের বিকল্প কোনো সুবিধা হতে পারে না।
এদিকে শুক্রবার ওমর হাদির নিয়োগের বিষয়টি সামনে এলে নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট দেন শহীদ হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা। তিনি লিখেন, “রাষ্ট্রের কাছে আমি এবং আমার সন্তানের একমাত্র দাবি আমার স্বামী শহীদ ওসমান হাদি হত্যার বিচার। জাগতিক সকল চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে ওসমান হাদি হত্যার ন্যায় বিচার।” শহীদ স্ত্রীর এই প্রতিক্রিয়া নিশ্চিতভাবে একটি বিশেষ ইঙ্গিত দেয়।
সেই প্রেক্ষাপটে ওমর হাদির কূটনৈতিক নিয়োগ শুধু কোনো সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ইঙ্গিত বহন করে। প্রশ্নটা তাই শুধু একজন ভাইয়ের ব্যক্তিগত লোভ নিয়ে নয়; প্রশ্নটা রাষ্ট্র কীভাবে হত্যা, বিচারহীনতা এবং দায় এড়ানোর সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখে, তা নিয়ে।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই ওসমান হাদির পরিবারের জন্য কিছু করতে চায় তাহলে করা উচিত ছিল তার ৯ মাস বয়সি অবুঝ সন্তান ফিরনাস বিন ওসমানের জন্য। করা উচিত ছিল একমাত্র অবলম্বন হারানো শহীদ হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পার জন্য। বিশেষ করে হাদির অবুঝ সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় রেখে তার নামে ফিক্সড ডিপোজিট করে দিতে পারতো। অথবা হাদির স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র করে দিতে পারত, যা হাদির স্ত্রী-সন্তানের আর্থিক নিশ্চয়তা কিছুটা নিশ্চিত করত। কিন্তু সেটা না করে কেনো এই কৌশল? তবে কি এটা শহীদ হাদি হত্যার বিচার দাবিতে করা আন্দোলনকে নিষ্ক্রিয় করা সমঝোতা?
এখানে বিষয়টি ব্যক্তিগত লোভে সীমাবদ্ধ থাকলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য অনেক গভীর। একজন শহীদের ভাই যখন রাষ্ট্রের দেওয়া পদ গ্রহণ করেন, তখন তা কেবল তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকে না; তা শহীদের রক্তের ওপর রাষ্ট্রের দায় এড়িয়ে যাওয়ার দলিল হয়ে ওঠে।
তবে বাংলাদেশে এ ধরনের কৌশল নতুন কিছু নয়। অতীতে বহুবার দেখা গেছে— রাজনৈতিক হত্যা, গুম বা নিপীড়নের ঘটনায় সরাসরি বিচার না করে ভুক্তভোগী পরিবারকে কোনো না কোনোভাবে ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা হয়েছে। কখনো চাকরি, কখনো বিদেশে সুযোগ, কখনো নীরব সমঝোতা। এতে রাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক চাপ কমে, কিন্তু ন্যায়বিচার চিরতরে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
ওমর হাদির এই নিয়োগ সেই পুরোনো কৌশলেরই আরেকটি সংস্করণ। একদিকে শহীদ ওসমান হাদির হত্যার বিচার ঝুলে থাকে, অন্যদিকে তার ভাই রাষ্ট্রের কাছ থেকে একটি লোভনীয় পদ গ্রহণ করেন। এতে রাষ্ট্র একটি সুবিধাজনক বার্তা ছড়াতে পারে— পরিবার তো আর আপত্তি করছে না। আন্দোলন তো আর আগের মতো ধারালো নয়।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তিতে। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল আত্মত্যাগ, ন্যায়বিচার আর আপসহীনতার ভাষা নিয়ে, সেখানে এখন প্রশ্ন ঢুকে গেছে। আর আন্দোলনে প্রশ্ন ঢুকলেই রাষ্ট্র স্বস্তি পায়।
এখানে দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়, দায় ব্যক্তিরও। কারণ রাষ্ট্র সুযোগ দেয়, কিন্তু গ্রহণ করা বা না করা ব্যক্তির সিদ্ধান্ত। একজন শহীদের ভাই যখন সেই সুযোগ গ্রহণ করেন, তখন তা আর নিছক ব্যক্তিগত থাকে না। তখন সেটি শহীদের রক্তের দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। তখন সেটি ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।
এই ঘটনায় রাষ্ট্র হয়তো সাময়িক স্বস্তি পেয়েছে। কিন্তু সমাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক উদাহরণ হারিয়েছে। আর শহীদ ওসমান হাদির হত্যার বিচার প্রশ্নে যে অনমনীয় অবস্থান তৈরি হচ্ছিল, সেখানে পড়েছে এক গভীর ফাটল।
রাষ্ট্র যদি মনে করে বিচার এড়াতে কিছু পদ-পদবি দিলেই দায় শেষ হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন একটাই— এই দেশে ন্যায়বিচার আসলে কাদের জন্য?
- লেখক, বার্তা সম্পাদক, দৈনিক খোলা কাগজ
