যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান পরিকল্পনায় কেন অস্বস্তিতে আরব দেশগুলো
রাফিউল ইসলাম তালুকদার
প্রকাশিত : ০৬:৪২ পিএম, ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ রোববার
একসময় মধ্যপ্রাচ্যের বহু আরব রাষ্ট্র, বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে সামরিক অভিযানের ধারণাকে ইতিবাচকভাবে দেখত। ইরানকে তারা দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রধান হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে সম্ভাব্য হামলার কথা বিবেচনা করছেন, এমন খবরে আরব দেশগুলোতে উদ্বেগ বাড়ছে। একসময় যারা তেহরানের কট্টর বিরোধী ছিল, তারাই এখন ওয়াশিংটনকে অনুরোধ করছে যেন ইরানে নতুন করে সামরিক আঘাত না হানা হয়।
এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে কী কারণ? বিষয়টি বুঝতে হলে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা করে দেখা জরুরি।
গত প্রায় আড়াই বছরে আরব নেতারা ইসরায়েলের লাগাতার সামরিক অভিযান প্রত্যক্ষ করেছে। গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে দখল জোরদার, সিরিয়া ও লেবাননে হামলা, সব মিলিয়ে ইসরায়েলের আঞ্চলিক ভূমিকা আরব রাষ্ট্রগুলোর চোখে নতুনভাবে ধরা দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বারবার উঠে এসেছে ইসরায়েলের তথাকথিত "গ্রেটার ইসরায়েল" ধারণা। যার আওতায় ইউফ্রেটিস থেকে নীল নদ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্য দেখা যাচ্ছে বলে আরব নেতাদের আশঙ্কা। তাদের মতে, ইসরায়েলের বর্তমান নীতি শুধু ফিলিস্তিন ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারে ইসরায়েলের নজিরবিহীন হামলা এই উদ্বেগকে আরও তীব্র করেছে। কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া সত্ত্বেও এই আক্রমণ আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে স্পষ্ট বার্তা দেয়, ইসরায়েল প্রয়োজনে যে কাউকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে।
আরব রাষ্ট্রগুলোর দৃষ্টিতে ইরানের অবস্থানও আগের মতো নেই। ২০২৩ সালের পর থেকে নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি হামলায় দুর্বল হয়ে পড়েছে ইরান। দেশটির সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বলয়ও ধাক্কা খেয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের টানা হামলা ইরানের মিত্র নেটওয়ার্ককে দুর্বল করেছে।
এই বাস্তবতায় অনেক আরব সরকারের মূল্যায়ন, ইরান ইতোমধ্যেই চাপে আছে। নতুন করে বড় সামরিক হামলা চালালে তা অপ্রয়োজনীয়ই নয়, বরং বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আরব দেশগুলো দুর্বল ইরানকে সহনীয় মনে করলেও, সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া ইরানি রাষ্ট্রকে তারা ভয়াবহ ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। তারা মনে করে, ইরান প্রতিশোধ নিলে হরমুজ প্রণালি হুমকির মুখে পড়তে পারে, যা বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ঘিরে অস্থিরতা বাড়তে পারে, যা মিসরের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হবে। শরণার্থী সংকট ও সশস্ত্র বিশৃঙ্খলা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এই ঝুঁকিগুলো আরব রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব রাষ্ট্রগুলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের দিকেও এগিয়েছে। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। ২০২৫ সালে কাতারে ইসরায়েলের হামলার পর এই যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। মিসরের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্ক উন্নতির পথে।
এই কূটনৈতিক বাস্তবতা ইঙ্গিত দেয়, আরব দেশগুলো এখন সংঘাতের বদলে ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি এসেছে হুমকি মূল্যায়নের জায়গায়। একসময় সৌদি আরবের চোখে ইরান ছিল প্রধান শত্রু, কাতারের চোখে সৌদি আরব, আর মিসরের কাছে কাতার। এখন সেই সমীকরণ ভেঙে যাচ্ছে।
বর্তমানে বহু আরব সরকারের দৃষ্টিতে, ইসরায়েলই অঞ্চলের সবচেয়ে অস্থিতিশীল শক্তি। সীমান্ত উপেক্ষা করে হামলা, আন্তর্জাতিক আইনকে পাত্তা না দেওয়া এবং প্রকাশ্য আঞ্চলিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে।
এই বাস্তবতায় আরব রাষ্ট্রগুলো মনে করছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা হলে তা ইসরায়েলের আগ্রাসনকে আরও উৎসাহিত করবে এবং পুরো অঞ্চলকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক উত্তেজনা প্রশমনের বক্তব্যে কিছুটা স্বস্তি এলেও, আরব নেতারা জানেন- পরবর্তী পদক্ষেপ যেকোনো সময় পরিস্থিতি আবার বদলে দিতে পারে।
অদ্ভুত হলেও সত্য, ইসরায়েলি আগ্রাসন ও তার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনই বিভক্ত মধ্যপ্রাচ্যকে নতুনভাবে এক জায়গায় আনছে, অভিন্ন স্বার্থে নয়, বরং অভিন্ন আশঙ্কার ভিত্তিতে
