সোমবার   ১২ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ২৯ ১৪৩২   ২৩ রজব ১৪৪৭

শ্রীমঙ্গলে এক বছরে ৬৭ বন্যপ্রাণী উদ্ধার

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

প্রকাশিত : ০৭:২৫ পিএম, ১২ জানুয়ারি ২০২৬ সোমবার

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় মানুষের বসতিতে বন্যপ্রাণীর অনুপ্রবেশ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। গত এক বছরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট ৬৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, শ্রীমঙ্গল শাখা। বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়া, খাদ্যের ঘাটতি এবং মানুষের অবাধ চলাচলই এই পরিস্থিতির মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন কুমার দেব সজল জানান, গত বছরের ১৮ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে এসব উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। উদ্ধার পাওয়া প্রাণীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিল অজগর সাপ (২৩টি), লজ্জাবতী বানর (৯টি), গন্ধগোকুল (৬টি), বনবিড়াল (৪টি), শঙ্খচিল (৪টি), বেতা জরা সাপ (৩টি), দারাশ সাপ (২টি) ও সবুজ কালি মনসা সাপ (২টি)। এ ছাড়া এককভাবে উদ্ধার হয়েছে সবুজ বোরাল (পিট ভাইপার), ভোঁদড়, জঙ্গলি পেঁচা, উল্টো লেজি সিংহ বানর, শিয়াল, বেজি, লক্ষ্মীপেঁচা, নীলকণ্ঠ পাখি, পদ্মগোখরা সাপ, জুনিয়া সাপ, সোনা গুঁইসাপ, ঘরগিন্নী পাখি, ভুবনচিল এবং সুন্দি কচ্ছপ।

স্বপন দেব সজল বলেন, ‘বনাঞ্চলে নির্বিচারে গাছপালা ও ঝোপঝাড় কেটে উজাড়ের ফলে বন্যপ্রাণীরা তীব্র খাদ্য সংকটে পড়ছে। বনভূমিতে মানুষের অবাধ প্রবেশ, জঙ্গল কেটে ফসল চাষ, বসতবাড়ি স্থাপন এবং অপরিকল্পিতভাবে রিসোর্ট ও ভিলা নির্মাণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।’

তিনি জানান, স্থানীয় বাসিন্দারা, বিশেষ করে শিশু ও কিশোররা যখন কোনো এলাকায় বন্যপ্রাণীর উপস্থিতির খবর দেয়, তখন দ্রুত সেখানে গিয়ে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হয়। আহত প্রাণীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং পরে বনবিভাগের কাছে হস্তান্তর করে পুনরায় বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়।

তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, উদ্ধার হওয়া অধিকাংশ প্রাণী বনের এক পাশের এলাকা থেকে পাওয়া গেলেও কমলগঞ্জ অংশে মানুষের সচেতনতা তুলনামূলকভাবে কম। সেখানে অনেক ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী হত্যা করা হচ্ছে। এমনকি বনের ভেতর ও আশপাশে বসবাসরত কিছু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এসব প্রাণী ধরে খেয়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে।

 

এলাকাবাসীর অভিযোগ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ শ্রীমঙ্গলের বিস্তীর্ণ বনভূমিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে গাছ কাটছে, বসতি গড়ে তুলছে এবং আনারস, লেবু ও চা চাষের পাশাপাশি রিসোর্ট ও ভিলা নির্মাণ করছে। এতে বনাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

তাদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের একটি অংশের নীরব সহযোগিতার কারণে এসব দখলদারের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। নিরাপত্তাহীনতার কারণে সাধারণ মানুষও প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছে না।

 

পরিবেশবিদদের মতে, দ্রুত বন রক্ষা ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব জনজীবন ও পরিবেশে গভীরভাবে প্রতিফলিত হবে।