রোববার   ১১ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ২৮ ১৪৩২   ২২ রজব ১৪৪৭

বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ ইরান, সামরিক শক্তি প্রয়োগের ঘোষণা আইআরজিসির

প্রকাশিত : ০৬:৩০ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২৬ শনিবার

ইরানে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে এবার আরও কড়া অবস্থান নিল দেশটির প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)। শনিবার (১০ ডিসেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে বাহিনীটি জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা তাদের কাছে ‘রেড লাইন’ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জননিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করা হবে।

 

এই ঘোষণাটি আসলো এমন এক সময়ে, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে তেহরানকে সতর্ক করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের পাশে থাকার কথা জানিয়েছেন। রুবিও শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাহসী জনগণের পাশে রয়েছে।’

 

গত রাতেও দেশটির বিভিন্ন শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরে একটি পৌর ভবনে আগুন লাগানো হয়। শিরাজ, কোম ও হামেদানে সংঘর্ষে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য সম্প্রচার করেছে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন।

 

মূলত লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদ থেকে দুই সপ্তাহ আগে আন্দোলন শুরু হলেও দ্রুত তা রাজনৈতিক রূপ নেয়। অনেক বিক্ষোভকারী বর্তমান ধর্মীয় শাসনব্যবস্থার অবসান দাবি করছেন। তবে তেহরান কর্তৃপক্ষ শুরু থেকেই এই অস্থিরতার পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উসকানির অভিযোগ করে আসছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, এই আন্দোলনে ইতোমধ্যে বহু মানুষ নিহত হয়েছেন।

 

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ সীমিত রাখা হয়েছে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের এক প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যমকে জানান, ওই এলাকায় রেভল্যুশনারি গার্ডস মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালাচ্ছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে তিনি নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।

 

রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রচারিত আরেক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, গত দুই রাতে ‘সন্ত্রাসীরা’ সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে এবং এতে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। সরকারি সম্পদে অগ্নিসংযোগকে তারা অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করে জানায়, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের অর্জন ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করা তাদের জন্য আপসহীন বিষয়।

 

এদিকে নিয়মিত সেনাবাহিনীও ঘোষণা দিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নির্দেশনায় তারা ‘জাতীয় স্বার্থ, কৌশলগত অবকাঠামো এবং জনগণের সম্পদ’ রক্ষায় প্রস্তুত থাকবে।

 

দেশের ভেতরে ক্ষোভ যখন বাড়ছে, তখন নির্বাসিত শেষ শাহর পুত্র রেজা পাহলভি বিদেশ থেকে আন্দোলনকারীদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এখন কেবল রাস্তায় নামা নয়; আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে শহরের কেন্দ্রগুলো দখল করা এবং সেগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা।’ তিনি পরিবহন, তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতের শ্রমিকদের দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাকও দেন।

 

তবে ট্রাম্প ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, তিনি পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাতে আগ্রহী নন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো নির্দিষ্ট বিরোধী নেতৃত্বকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

 

এর মধ্যেই ট্রাম্প শুক্রবার নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আপনারা (ইরান সরকার) গুলি চালানো শুরু করবেন না, কারণ তাহলে আমরাও গুলি চালানো শুরু করব।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি আশা করি ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকবে, কারণ ওই দেশ এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হয়েছে।’

 

কিছু আন্দোলনকারী পাহলভির পক্ষে স্লোগান দিলেও অধিকাংশের দাবি ধর্মীয় শাসনের অবসান এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির সংস্কার। উত্তর-পশ্চিম ইরানের এক চিকিৎসক জানান, শুক্রবার থেকে বিপুলসংখ্যক আহত বিক্ষোভকারী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। অনেকের মাথায় গুরুতর আঘাত, হাত-পা ভাঙা ও গভীর ক্ষত রয়েছে। অন্তত ২০ জনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আনা হয়েছিল, যাদের মধ্যে পাঁচজন পরে মারা যান।