বৃহস্পতিবার   ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   মাঘ ২২ ১৪৩২   ১৭ শা'বান ১৪৪৭

আবারও ২৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প, তবু খুলনায় লবণমুক্ত পানি অনিশ্চিত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত : ১১:৩৪ এএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ বৃহস্পতিবার

এর আগে ২৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয় করেও খুলনা নগরবাসীর পানির কষ্ট ঘোচেনি। এবারও প্রায় ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন পানি সরবরাহ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যার কার্যকারিতা নিয়ে শুরুতেই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মধুমতী নদীর পানিতে অতিরিক্ত লবণ থাকায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেও শুষ্ক মৌসুমে নিরাপদ পানি পাওয়া যাবে না।

নতুন প্রকল্পের পরিকল্পনা

‘পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২’-এর আওতায় আগের পরিশোধন কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিদিন ১৩ কোটি লিটার পানি সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। রিজার্ভারে ১১৫ কোটি লিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে এবং ভূগর্ভ থেকে দৈনিক আরও ৫–১০ কোটি লিটার পানি তোলা হবে। এ ছাড়া ২৫৮ কিলোমিটার নতুন পাইপলাইন, চারটি রিজার্ভার, চারটি ওভারহেড ট্যাঙ্ক এবং ২৫ হাজার ৮০০ নতুন সংযোগ স্থাপন করা হবে।

কেন প্রশ্ন উঠছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধুমতী নদীর পানি মার্চ থেকে মে মাসে অতিমাত্রায় লবণাক্ত হয়ে পড়ে, কখনও চার মাস পর্যন্ত তা ব্যবহারের অযোগ্য থাকে। প্রকল্পে লবণ অপসারণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি, বরং গরমকালে ভূগর্ভের পানির সঙ্গে মিশিয়ে সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে একদিকে নদীর লবণাক্ত পানি ব্যবহারের উপযোগী হবে না, অন্যদিকে ভূগর্ভের পানির ওপর চাপ আরও বাড়বে।

২০১৮ সালে প্রথম প্রকল্পে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা খরচ করে একই ছকে পরিকল্পনা নেওয়া হলেও শুষ্ক মৌসুমে নগরবাসীকে লবণাক্ত পানি কিনতে হয়েছিল। এবারও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন নাগরিক সমাজ।

ভূগর্ভের পানির সংকট

গবেষণা বলছে, খুলনার অধিকাংশ ওয়ার্ডের ভূগর্ভের পানি ইতোমধ্যে অনুপযোগী হয়ে গেছে। জলাশয় ভরাট হওয়ায় বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে রিচার্জ হচ্ছে না। দীর্ঘ মেয়াদে এতে ভূগর্ভের মিষ্টি পানির স্তর শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, “লবণাক্ততা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। বিকল্প চিন্তা না করলে এই প্রকল্পও ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।” খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী মনে করেন, “ওয়াসা যেভাবে মধুমতীর পানি ও ভূগর্ভের ওপর নির্ভর করছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর।”

ওয়াসার সাফাই

ওয়াসার নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত এমডি আবু ছায়েদ মোহাম্মদ মনজুরুল আলম বলেন, “দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীরা জানিয়েছে, এই অঞ্চলে মধুমতী নদীতেই লবণাক্ততা সবচেয়ে কম। লবণ পরিশোধন প্লান্ট বসাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ হবে এবং পরিচালন ব্যয় ৮–১০ গুণ বেড়ে যাবে।”

নাগরিকদের ক্ষোভ

খুলনার সাধারণ মানুষ বলছেন, আগের প্রকল্পে টাকাও খরচ হয়েছে, কষ্টও রয়ে গেছে। নতুন প্রকল্পেও যদি একই পরিস্থিতি হয়, তাহলে বিপাকে পড়বে নগরবাসী।

তাই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আরও ২৫৯৮ কোটি টাকা খরচের পরও খুলনা নগরীর মানুষ কি আদৌ লবণমুক্ত নিরাপদ পানির স্বাদ পাবে?