বৃহস্পতিবার   ০১ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ১৮ ১৪৩২   ১২ রজব ১৪৪৭

নিজের কাজে উৎসাহ না থাকলে, এগিয়ে যাওয়া যায় না

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত : ০২:১৮ পিএম, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ বুধবার

আমি যখন রেলক্রসিংয়ের বারটি ওঠা-নামা করি এবং লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রেনের চালককে যাওয়ার সংকেত দিই, তখন আশপাশের মানুষ কৌতূহলবশত আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। অনেকে কাছে এসে প্রশ্ন করে, তুমি এই কাজ করো? তখন আমি হাসিমুখে বলি, হ্যাঁ, আমি এই কাজ করি। এটাই আমার কাজ। নিজের কাজে উৎসাহ না থাকলে, সে কাজটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না। মূলত নিজের কাজটি সঠিকভাবে করতে পারলে, তাতে আনন্দ খুঁজে পাই।’জয়দেবপুর-রাজশাহী রেললাইনের গাজীপুরের কালিয়াকৈরের কালামপুর রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার ইভা আক্তারের (৩০) সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।ইভা আক্তার গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ছোট দেওড়ার মো. লিটন খানের স্ত্রী। তাঁদের সংসারে লাইভা খান নামের পাঁচ বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। মেয়ে বাড়ির পাশে ছোট দেওড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে লেখাপড়া করে। তাঁর স্বামী স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।কালামপুরের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মো. শাহ আলম বলেন, ‘একসময় কালামপুর রেলক্রসিংয়ে কোনো গেট ছিল না। তখন প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটত। পরে এখানে গেট বেরিয়ার নির্মাণ করা হয়। আগে গেটে পুরুষদেরই দায়িত্ব পালন করতে দেখেছি, কিন্তু প্রথম একজন নারীকে এই কাজে দেখলাম। বিষয়টি খুবই ভালো লেগেছে। নারীরা এখন সব দায়িত্বই সঠিকভাবে পালন করছেন।’স্থানীয় সবজি বিক্রেতা হাশেম মিয়া বলেন, ‘পুরুষ গেটম্যানদের দেখতাম, গেট রেখে পাশে গিয়ে চা খাচ্ছে, আড্ডা দিচ্ছে। ট্রেন আসলে দৌড়ে গেটে যেত। কিন্তু মেয়েটাকে দেখি গেটের পাশে তাদের ঘরের দরজায় চেয়ারে ফেলে বসে থাকছে এবং সঠিক সময়ে গেট নামিয়ে দিচ্ছে, ট্রেন চলে গেলে দ্রুত গেট উঠিয়ে দিচ্ছে।’ইভা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এইচএসসি পাস করে প্রায় চার বছর আগে রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে গেটকিপারের চাকরি নিই। শুরুতে ঈশ্বরদীতে (টি-৩৭) গেটে দায়িত্ব পালন করি। ১০ দিন ধরে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা ত্রিমোড় থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে কালামপুর (ই-১৬ গেট) রেলক্রসিংয়ে দায়িত্ব পালন করছি। মেয়েরা সব কাজেই এগিয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে থাকার মতো নয়। এই কাজের জন্যও সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। ট্রেন আসছে, গেট নামাচ্ছি, অথচ অনেকেই গাড়ি থামাচ্ছে না। জোর করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন ক্রসিং করার চেষ্টা করে। তখন মনে কষ্ট হয় এই ভেবে, আমরা তাঁদের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে দায়িত্ব পালন করছি, অথচ তাঁরা কথা শুনছে না বা গেট উঁচু করে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছে।’ইভা আক্তার আরও বলেন, ‘আমরা মানুষের নিরাপত্তা দিয়ে থাকি। কিন্তু আমরা যে টাকা বেতন পাই, তা দিয়ে সংসার ভালো চলে না। সরকার আমাদের বেতন–ভাতা আরেকটু বৃদ্ধি করলে আমরা আরেকটু স্বাচ্ছন্দ্যে বাঁচতে পারতাম। আমি টানা চার বছর ঈশ্বরদীর ব্যস্ততম গেটে (টি-৩৭) দায়িত্ব পালন করেছি। আল্লাহর রহমতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। ঈশ্বরদীতে থাকাকালীন আরও দুজন নারী আমার সঙ্গে গেটকিপারের দায়িত্ব পালন করতেন। এখানে পালা করে ৮ ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করি।’জয়দেবপুর জংশনের স্টেশন মাস্টার রেজাউল ইসলাম বলেন, রেলওয়ের গেটকিপারে এখন অনেক নারী কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। নারীরা এই কাজে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। তাঁদের কাজে এখনো কোনো অবহেলার অভিযোগ শোনা যায়নি।