ছাব্বিশ বছর ঝুলে আছে খান জাহান আলী বিমানবন্দর, আদৌ হবে কি?
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত : ০৯:৪৭ এএম, ১৬ জানুয়ারি ২০২৩ সোমবার
খান জাহান আলী বিমানবন্দর।
মোংলা বন্দরের অদূরে খুলনা-মোংলা সড়কের পাাশেই ফয়লায় খানজাহান আলী বিমানবন্দরের নির্মাণ কাজে গতি আসেনি গেল ২৬ বছরেও। কবে এটি বাস্তবায়ন হবে; সেই নিশ্চিয়তাও মিলছে না কারও কাছ থেকে। পদ্মাসেতু হয়ে যাওয়ার পর এই বিমানবন্দরের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সবমিলিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘ধীরগতির কাজের’ দাবি এলেও বড় অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়েছে খান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিভিন্ন সূত্র এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের দাবি বিমানবন্দরটি দ্রুত চালু করার। তারা বলছেন, বিমানবন্দর না-থাকায় খুলনা-বাগেরহাট আসতে চান না বিদেশি ব্যবসায়ীরা। সুন্দরবনে পর্যটকও কম আসছে। খুলনা থেকে প্রায় আড়াই-তিন ঘণ্টা সড়ক পথ পাড়ি দিয়ে যশোর বিমানবন্দর দিয়ে যাত্রা করতে গিয়ে বিপাকে পড়ে যান ব্যবসায়ীরা। বাগেরহাটের এই বিমানবন্দরটি চালু হলে মোংলা বন্দরেও আয় বাড়বে।
খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৯৬ সালে। তখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। বিমানবন্দরটিকে ‘শর্ট টেক অফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং বন্দর’ হিসেবে গড়ে তুলতে ৪১ দশমিক ৩০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাট করা হয়েছে। এরপর ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর বিমানবন্দরটির উন্নয়ন কাজও বন্ধ হয়ে যায়।এরপর ২০১১ সালের ৫ মার্চ খানজাহান আলী বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরেও আরও ৬২৬ দশমিক ৬৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির চার বছর পর ২০১৫ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটির অনুমোদন মেলে। একই বছরের জুলাইয়ে ফের শুরু হয় প্রকল্পটির কাজ। এরপর কেটে গেল আরও ছয়টি বছর। জমি অধিগ্রহণ, মাটি ভরাট ও সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ছাড়া কোনো কাজই হয়নি। প্রকল্প এলাকায় একটি সাইনবোর্ড থাকায় কেবল এটির অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। কবে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে, এটি দিয়ে বিমান ওঠানামা করবে কবে—সেই খবর কেউ দিতে পারছেন না।
জানতে চাইলে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সময় সংবাদকে বলেন, বাগেরহাটে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর মধ্যে খানজাহান আলী বিমানবন্দর অন্যতম। বিমানবন্দরের জমি অধিগ্রহণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মূল মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রায় ৮০ ভাগ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিমানবন্দরের প্রাচীরের কাজও শেষ পর্যায়ে। রামপাল উপজেলার উজলপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুন্সি বোরহান উদ্দিন জেড বলেন, আমাদের এলাকায় বিমান বন্দর হলে এ অঞ্চলে ব্যবসা বাণিজ্যের আমূল পরিবর্তন ঘটবে। মোংলাবন্দর এলাকায় বিনিয়োগ বাড়বে। এ ছাড়া খুলনা, বাগেরহাটসহ কয়েকটি জেলার সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। আকৃষ্ট হবেন সুন্দরবন ও ষাটগম্বুজ কেন্দ্রিক পর্যটকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, খানজাহান আলী তো পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) করার প্রস্তাব রয়েছে। এটা নিয়ে অনেক ঝামেলা রয়েছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময়ে এ নিয়ে অনেক বৈঠক হয়েছে। এ নিয়ে জটিলতা রয়েছে। তিনি বলেন, পদ্মাসেতু হয়ে যাওয়ার কারণে মানুষের যাতায়াত সহজ হয়ে গেছে। যে কারণে খানজাহান আলী বিমানবন্দরে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছেন না। কারণ এখানে বিনিয়োগ করা তাদের জন্য কতটা লাভজনক হবে; তা নিয়ে তারা সন্দিহান। বেসামরিক বিমান পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক প্রকৌশলী বলেন, ‘বিমানবন্দরটি পিপিপিতে হওয়ার কথা। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্তৃপক্ষ আছেন। পিপিপিতে পার্টি নিয়োগ দিতে ওরা কয়েকবার দরপত্র আহ্বান করেছে। কিন্তু পার্টি পাওয়া যায় না। কিন্তু তারা এটিকে লাভজনক বিবেচনা করছিলেন না।’
“সম্ভাব্যতা যাচাই করেও দেখা গেছে, আসলে পিপিপিতে এটি নির্মাণ করা সম্ভব হবে না। পিপিটিতে ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফাইন্যান্সিং (ভিজিএফ) নামের একটি তহবিল রয়েছে। সেখান থেকে তহবিল প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ এটি বাস্তবায়নে সরকারেরও সহায়তা লাগবে,” যোগ করেন তিনি। বেবিচক কর্মকর্তা বলেন, সর্বোপরি এটিকে নিড অ্যানালাইসিস (প্রয়োজনীয়তা বিশ্লেষণ) করতে হবে। কারণ পদ্মাসেতু হওয়ার পরে বরিশাল বিমানবন্দরের যাত্রী কমে গেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খানজাহান আলী বিমানবন্দর কতটা লাভজনক বা কার্যকর হবে (যেটা আগেই ভায়াবল ছিল না); তা ভেবে দেখতে হবে। হয়ত এটি কার্যকারিতার পর্যায়ে যেতে কিছুটা সময় লাগবে। যে কারণে খান জাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের কাজ কিছু ধীরে হচ্ছে।
তবে এটি বাস্তবায়ন হবে বলে জানান। ওই প্রকৌশলী বলেন, বিমানবন্দরটি ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন হবে, তবে এই মুহূর্তে এটিকে সম্ভাব্য কার্যকর একটি বিমানবন্দর হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ২০১৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্মাণাধীন বিমানবন্দরটি পরিদর্শনকালে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, এ বিমানবন্দরটি বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক হবে। কারণ রামপাল তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, পাশে মোংলা বন্দর ও খুলনা রয়েছে। এখানে বিমানবন্দর হওয়াটা যৌক্তিক বলেই এটার অনুমোদন হয়েছে। বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মাহবুব আলী অবশ্য আশার কথা শুনিয়েছেন। গত রোববার (৮ জানুয়ারি) সময় সংবাদকে তিনি বলেন, খানজাহান আলী বিমানবন্দরের জন্য জমি অধিগ্রহণ করে সীমানা দেয়াল নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। সবকিছু আমাদের দখলে আছে। এখন শুধু করার অপেক্ষায়। সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল এ সমস্ত প্রকল্প যাতে পিপিপিতে করা হয়। এরমধ্যে দরপত্র আহ্বানও করা হয়েছে।
“একজন অংশগ্রহণও করেছেন। কিন্তু তাদের দেয়া শর্তাবলী আমরা ভায়াবল (কার্যকর) মনে করিনি। তারা যাত্রীপ্রতি অতিরিক্ত এক হাজার টাকা করে দাবি করেছেন। যা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক হবে না। এখন যদি দুই হাজার টাকা হয় টিকিটের দাম, আর বিমানবন্দরের জন্য এক হাজার টাকা আলাদা করে দিতে হয়, তখন সেটা চাপ হয়ে যাবে,” বললেন প্রতিমন্ত্রী। যে কারণে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি বলে তিনি জানান। মাহবুব আলী বলেন, পরবর্তী সিদ্ধান্ত কীভাবে নেয়া হবে; তা নিয়ে ভাবা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। করোনা আসার কারণে সংকট দেখা দিয়েছে।
বিমানবন্দরটি বাস্তবায়নের কোনো অনিশ্চয়তা আছে কিনা; জানতে চাইলে বিষয়টি তিনি উড়িয়ে দেন। বললেন, তেমন কিছু না। জায়গা তো প্রস্তুত। পিপিপিতে করার সিদ্ধান্ত থাকলেও সেই সময়ে তা বাণিজ্যিকভাবে ফলপ্রসূ মনে করা হয়নি। যে কারণে এটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে আমাদের সবকিছু প্রস্তুত। মাহবুব আলী বলেন, এরপর করোনা মহামারি এলো, তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। কিন্তু তাই বলে এটি নিয়ে অনিশ্চয়তার কিছু নেই।
পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে কোনো সিদ্ধান্ত আসবে কিনা; প্রশ্নে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি তো আপনারাই দেখছেন। বড় বড় প্রকল্প নির্বাচনের আগে কতটুকু নেয়া যাবে, তা বুঝতেই পারছেন। বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে, এই প্রকল্প বাস্তবায়নে তার প্রভাব রয়েছে কিনা; জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তা বলা যাবে না। সরকারের নীতিগত যে সিদ্ধান্ত, আপাতত বড় বড় প্রকল্পগুলো এই মুহূর্তে বাস্তবায়ন না করার বিষয়ে ভাবতে হচ্ছে।’ “আবার এ বছরে বৈশ্বিক সংকটের একটি পূর্বাভাসও রয়েছে জাতিসংঘ থেকে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার সংকট রয়েছে ইউক্রেনযুদ্ধকে কেন্দ্র করে, সেসব বিবেচনায় নিয়ে হয়তো আগামী বছর যখন সংকট কেটে যাবে, তখন চিন্তাভাবনা করা হবে,” যোগ করেন মাহবুব আলী।
