শুক্রবার   ০২ জানুয়ারি ২০২৬   পৌষ ১৯ ১৪৩২   ১৩ রজব ১৪৪৭

মুক্তিযোদ্ধাদের ২৪ শে মার্চ ও ১৬ই ডিসম্বর নিয়ে কিছু কথা

সেলিনা বেগম-

প্রকাশিত : ১০:৫৭ এএম, ২৫ ডিসেম্বর ২০২২ রোববার

বহুবছর পর ফিরে গেলাম ২৪ শে মার্চ ও ১৬ই ডিসম্বের। আমি তখন ক্লাশ
এইটে পাড়ি। শুনলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্ঠে আমি যদি না ও থাকি যার
যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ো। শত্রুর মোকাবিলা করো।
২৪ শে মার্চ হতে ১৬ই ডিসেম্বর ও তার পরও যা দেখেছি ও শুনেছি। ১৯৭০
সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীনে
আওয়ামিলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানী সেনানেতিৃত্ব ও
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ষড়যন্ত্র চালাতে থাকে যাতে বিজয়ী দল ক্ষমতায় না
থাকে। এভাবে দুই পক্ষই কয়েকদফা আলোচনা হয়। কিন্তু ইয়াহিয়া খাঁন ২৫শে
মার্চ বাঙ্গালীর উপর গনহত্যা চালানোর হুকুম দিয়ে তার দেশ পাকিস্তানে চলে
যায়।
আরেক উর্ধতন সেনা কর্মকর্তা রাও ফরমান আলি বলছেন যাও বাংলার সবুজ
জমি বাঙ্গালিদের রক্তে লাল করে ঢেকে দাও।
পাকিস্তানী সেনা বাহিনীরা ২৫শে মার্চ রাতেই বাংলাদেশের প্রতিটি
শহরের পীচঢালা পথ ধরে সার্চলাইট জ্বালীয়ে শুরু করে ঘুমন্ত মানুষ হত্যা করার
জন্য রাস্তায় ট্যাঙ্কের রহর নামায়। শুরু করে এলোপাথারি গুলি বর্ষন। প্রথমেই
মারতে থাকে ধনী হিন্দু লোকদের। ওদের মেরে রাস্তায় ফেলে রাখে। তারপর খুজতে
থাকে বাঙ্গালী এক্স মিলেটারী ও বাঙ্গালী মিলেটারীদের। খুজে খুজে বের করে না
মেরে ধরে নিয়ে গিয়েছে টর্চার সেলে। শুরু করে ঘরে ঘরে লুটতরাজ। জ্বেলে
দেয় আবাসভূমিতে আগুন। শুরু করতে থাকে নারিদের সম্ভ্রমহানী। কোন
পুরুষের দেখা পেলেই পরণের কাপড় খুলে দেখে নেয় তাদের খৎনা করা নাকি।
হানাদার বহিনীর অত্যাচারে আমার দেশের যুবকরা এবং কিছু মেয়েরাও চলে
যায় পার্শবর্তী দেশ ভারতে। যারা কোন দিন অস্র দেখেনি তারাই ও দেশে
গিয়ে অস্র চায়, ভাত চায়না। ইন্দিরা গন্ধী ও তার দেশের মানুষরা আমাদের
যুবক যুবতীদেরকে অস্র দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে ও থাকার যায়গা দিয়েছে,

চিকিৎসার ঔষধ দিয়েছে। ও দেশে চলে যাওয়া আমাদের দেশের সেনারা ভারতের
সেনারা মিলে যুবক যুবতীদের অস্র চালানো শিখিয়েছে। দেশ জয় করার
প্রত্যেকটা কৌশল শিখিয়ে দিয়েছে।
মুক্তি বাহিনীরা না খেয়ে রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে
নিজ দেশে আসে শত্রু নিধন করতে করতে। এতে হানাদারনা আরো ক্ষেপে যায়।
এই দেশে গজিয়ে উঠে রাজাকার আল বদর। এরা বিশিষ্ট লোকের বাড়ী ঘর
দেখিয়ে দেয় আর নাম ঠিকানা ওদের দেয়। অতএবঃ শুত্রুদের আরো সুবিদা হলো।
মোক্তম সময়ে বাড়ী ঘেরাও করে ধরে এনে প্রচন্ড কষ্ট দিয়ে কাউকে মেরেছে,
কাউকে জল্লাদ খানায় নিয়ে নিত্যদিন রাত করতে থাকলো প্রহার। মুক্তি
যোদ্ধার নাম ও ঠিকানা বলছেনা কেন। ওরা মার খেয়েছে, যন্ত্রনা দায়ক অত্যাচার
সহ্য করেছে কিন্তু মুক্তি সেনার নাম বা ঠিকানা বলেনি। অবশেষে যাদের ধরে
নিয়ে টর্চার করেছে ওরা কি আর আছে? এবার হানাদাররা শুরু করলো
প্রতিটা গ্রামে গঞ্জে যাওয়া কেউ স্প্রীড বোর্টে কেউ নৌকায়। যখন
হানাদারদের বহন করে মাঝি গ্রামে গঞ্জে পৌঁছে দেয় মাঝির কেমন
লেগেছিলো? বাংলার মাঝির নিরবে কান্নায় কি আকাশ বাতাস কাপেনি?
গ্রামে গঞ্জে আঁকা বাাঁকা কাঁচা সরু পথ ধরেই রাইফেল মেশিনগান
নিয়ে যেতো গ্রামের ঘরে ঘরে। বাবা, ভাই, স্বামীর সামনেই সম্ভ্রম হানি
করেছে আর অট্টহাসিতে বাংলার বাতাসকেও কাদিয়েছে। পুরুষদের গুলিকরে
মেরে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। মানুষের গরু খাশী এনে এনে উল্লাস
করেছে আর তারই মাংশ খেয়েছে। স্কুল কলেজের বেঞ্চ ভেঙ্গে পুড়িয়ে রান্না
করেছে। কোন কেনা সুন্দরী মা বোনকে ধরে এনে এক সাথে জড়ো করে যখন
তখন শ্লীলতাহানী করেছে। অনেকগুলি মেয়ে, মহিলার পেটে যখন বাচ্ছা চলে
আসতো তাদের সারি করে নিয়ে যেতো নদীর তীরে নয়ত কোন গভীর প্রাচীন
কুয়ার ধারে। সবাইকে এক সাতে ব্রাশ ফায়ার করে নদীতে বা কুয়ায় ফেলে

দিয়েছে। সবশেষে হত্যা করেছে বুদ্ধিজিবীগণকে বদ্ধভূমিতে। বদ্ধভূমি হতে
আজও মনে হয় জয়বাংলা বলার আওয়াজ শুনেতে পাই। শত কন্ঠের আওয়াজ।
ষোলই ডিসেম্ভর আমাদের মুক্তিসেনারা দেশ স্বাধীন করে নিজ দেশে এসে
ট্রাকে ট্রাকে করে এক হাতে জাতীয় লাল সবুজ পতাকা, অন্য হাতে শত্রু
নিধনের অস্র। উল্লাসিত হয়ে মিলিত স্বরে উচ্চ ধনিতে বলতে থাকলো জয়
বাংলা। এভাবে বাংলার সারা শুরু ওরা ঘুরেছে।

এবার আসি ১৬ই ডিসেম্বরের পরের কয়েকটি দিনের দেখায়। আমি ছিলাম
কুমিল্লার জেলখানার ডাঃ আব্দুর রউফ মামার বাসায়। এক সন্ধ্যায় দেখি মাঠের
একদিকে একটি ট্রাক থামলো আর ট্রাকের কয়েকটি বাসা থেকে ছেলে
মেয়েরা বোরকা নিয়ে ট্রাকের কাছে গেলো। যাওয়া মাত্র বোরগায় ঢাকা
কয়েকজন মহিলা যার যার ছেলে মেয়ের সাথে তার তার ঘরে নিঃশব্দে চলে গেলো।
হয়তো ছেলেমেয়েদের স্বজন ছিলো।
কয়েক দিন পর আমাদের বাসায় আমার মা নিয়ে গেলেন। তখনতো আমি
ছোটওনা বড়ওনা। স্বাধীন কিছু দেখতে রাস্তায় গেলাম। কি দেকতে
বেরিয়েছি নিজেও জানিনা। তবে এটা জানতাম এখন রাস্তায় হানাদার নেই,
কোন শত্রু নেই যেখানে খুশি যেতে পারি। বড় রাস্তা দিয়ে কয়েকটি ট্রাক
যাচ্ছিলো। সামনের একটা ট্রাকের তেপাল উড়ে ফাকা হয়ে গিয়েছিলো। যে
দৃশ্য দেখেছি বিশ্বিত ও অবাক হয়ে গিয়েছি। ঘন হয়ে দাড়ানো উঠতি
বয়সের মেয়ে, কারো পাড়নে, গায়ে কাপড় নেই। কেউ মুখ দুহাতে ঢেকে
রেখেছে, কেউ কাঁদছে নিঃশব্দে, এলো মেলো চুলে কেউ দাড়িয়ে আছে
উদাস দৃষ্টিতে।

স্বাধীনতা এসেছে মুক্তিযোদ্ধাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে, স্বাধীনতা এসেছে
মা বোনদের শ্লীলতাহানী দিয়ে, স্বাধীনতা এসছে হাজার হাজার
মুক্তিযোদ্ধাদের পঙ্গুত্বে, স্বাধীনতা এসেছে অনেকের সমস্থ খুইয়ে।
স্বাধীনতা এসেছে বদ্ধভূমীতে শহীদদের মৃত্যু যন্ত্রনায়, আর্তনাদে। শত শত
বুদ্ধিজীবীদের আর্তনাদ যেন আজও আমার কানে আসে। আর আজও আমার
দৃষ্টিতে ভাসে মুক্তিবাহিনীর জয়ের আনন্দ উল্লাস।
পাকিস্থান আমলে এসেম্বলীতে গাইতাম পাকিস্তান জিন্দাবাদ, জিন্নার
জিন্দাবাদ।
তু নিশী আজমে আলি শান আরসে পাকিস্তান

আজ আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ঃ (আমার
সোনার বাংলা আমি তোমাকে ভালবাসি) আমার দেশ আমার জাতীয় সঙ্গীত।