শরীয়তপুরে মসজিদের নামে চাঁদাবাজি, ব্যবসায়ীকে হত্যার হুমকি
নুরুজ্জামান শেখ, শরীয়তপুর
প্রকাশিত : ১১:১৬ এএম, ৩ জুলাই ২০২১ শনিবার
শরীয়তপুর সদর উপজেলার ডোমসার ইউনিয়নের আওতাধীন পশ্চিম কোটাপাড়ার লঞ্চ ঘাটটি ছিল অত্যন্ত ব্যস্ততম ঘাট। এক সময় ঢাকা যাওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল নদীপথ। নদীপথে মানুষ যাতায়াত করে অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ বোধ করত। মামামাল পরিবহনের সহজ মাধ্যম ছিল নদী পথ। সময়ের কালক্রমে নদীর নাব্যতার হারানোর কারণে মানুষ এখন নদী পথে যাত্রা ও মালামাল পরিবহন ভুলে যেতে বসেছে। আধুনিক যুগের যান্ত্রিক সভ্যতার কারণে অতি দ্রুত যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনে মানুষ এখন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। একসময় শরীয়তপুরের মানুষ নৌযান লঞ্চে ঢাকা যাতায়াত করতো। তখন পশ্চিম কোটাপাড়া সাবেক ঘাটটি লঞ্চ ঘাটে পরিণত হয়েছিল। তখন এই ঘাট থেকে নিরাপদ, বোগদাদীয়া-১১, খেওয়াপার, সুরেশ্বরের-১, লঞ্চ গুলো প্রতিদিন ছেড়ে যেত ঢাকার উদ্দেশ্যে। পশ্চিম কোটাপাড়ার লঞ্চঘাটটি ইজারাদারদের আওতাধীন ছিল এবং প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা তোলা হতো পরে তা সরকারি খাতে জমা হতো। শরীয়তপুর কীর্তিনাশা নদীর নাব্যতার হারানোর কারণে পশ্চিম কোটা পাড়ার লঞ্চ ঘাটটি একেবারে হারিয়ে গেছে। এই ঘাটে এখন আর বড় বড় লঞ্চ ভিড়েনা এবং মানুষ ঢাকাসহ অন্যান্য এলাকায় যেতে ঘাটে লঞ্চের জন্য অপেক্ষা করে না। তবে বর্তমানে এ ঘাট দিয়ে ইঞ্জিন চালিত ট্রলার এর মাধ্যমে মালামাল পরিবহন করা হয়। রড সিমেন্ট অন্যান্য প্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে এই পশ্চিম কোটাপাড়ার সাবেক ঘাটটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বর্তমানে এই ঘাটে নেই কোনো ডাক, নেই কোন ইজারাদার তবুও নিয়মিত মালামাল ওঠানামা করতে হলে ট্রলারমালিক কাছ থেকে এবং মালামালের মালিকের কাছ থেকে চাঁদা তোলা হয় জোরপূর্বক। সাবেক এই লঞ্চঘাটের কিছু অসাধু চক্র সুকৌশলে মসজিদের নামে রশিদ বানিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা চাঁদা তোলা হচ্ছে। অবৈধ এই চাঁদাবাজির কর্মকান্ড প্রশাসনের দৃষ্টিগোচরে নেই।
পশ্চিম কোটাপাড়া বাইতুন নূর জামে মসজিদের ইমামের সহযোগিতায় অসাধু চক্রের মূল হোতা দিন ইসলাম বেপারী ও ইমরান বেপারী মসজিদের টাকা আদায়ের রশিদের হুবহু নকল করে নতুন রশিদ বানিয়ে টলার প্রতি একশত পঞ্চাশ টাকা এবং ট্রলার থেকে মালামাল খালাস বাবদ মালিকেদের কাছ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা চাঁদা আদায় করে নিচ্ছে। ভুক্তভোগীরা প্রতিবেদককে বলেন, আমরা ট্রলারমালিক অসাধু চক্রের মূল হোতা দ্বীন ইসলাম বেপারী কাছে অত্যন্ত অসহায়। আমাদের এই ঘাটে টলার ভিরালেই টলার প্রতি একশত পঞ্চাশ টাকা এবং টলার থেকে প্রতি বস্তা সিমেন্ট খালাস করতে তাদেরকে দিতে হয় ২৫ পয়সা। এই ঘাট দিয়ে প্রতি দিন হাজার হাজার বস্তা সিমেন্ট খালাস হয়। অসাধু চক্রের মূল হোতা দ্বীন ইসলাম বেপারী ও তার সঙ্গীরা মসজিদের নাম ব্যবহার করে প্রতি মাসে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। প্রতিমাসে শরীয়তপুরের কমপক্ষে ২০ জন বিশিষ্ট ডিলার ব্যবসায়ীর মালামাল এই ঘাট দিয়ে খালাস হয়। আর মালামাল খালাস করলেই মালিকদের দিতে হয় চাঁদা। চাঁদাবাজদের কিছু বলতে গেলেই মালিকদের সাথে করে খারাপ আচরণ। পূর্ব কোটাপাড়া প্রেমতলা বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সেনাবাহিনীর সাহসী সৈনিক মোক্তার হোসেন চৌকিদার ফ্রেশসিমেন্ট এর ডিলার। তার সিমেন্ট ও পশ্চিম কোটাপাড়ার লঞ্চ ঘাট দিয়েই খালাস করতে হয়। এ ঘাট দিয়ে মাল খালাস করলেই দিন ইসলাম বেপারী কে দিতে হয় চাঁদা। ভুক্তভোগী মুক্তার হোসেন চৌকিদার গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি গত কয়েক মাসে এই ঘাট দিয়ে দশ হাজার বস্তা সিমেন্ট খালাস করি এবং প্রতি বস্তা ২৫ পয়সা হারে খালাস করতে আমাকে গুনতে হয় ২৫০০ টাকা। এভাবে প্রতিবার মসজিদের নামে করা নকল ও কার্বন বিহীন রশিদের মাধ্যমে চাঁদা দাবি করে ওরা অবৈধ উপায়ে হাতিয়ে নিচ্ছে সিমেন্ট মালিকদের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা। আমি গত ৩০ জুন সন্ধ্যা সাতটার দিকে পশ্চিম কোটা পাড়া নদীর পাড় বাইতুন নুর জামে মসজিদ লঞ্চ ঘাটে বাকি টাকা দিতে গেলে দিন ইসলাম ব্যাপারির কাছ থেকে টাকা আদায়ের রশিদ চাইলে দিন ইসলাম আমার সাথে খারাপ আচরণ করে এবং প্রাণনাশের হুমকি দেয়, এমনকি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বালতি দিয়ে মাথায় আঘাত করে। ওই সময় ঘটনাস্থলে আমার ম্যানেজার সহ আশেপাশের সাধারণ লোকজন উপস্থিতিতে আমি প্রানে রক্ষা পাই। তারপর অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে চলে আসি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি চলে যাই। আমি পরের দিন সুষ্ঠু বিচারের দাবীতে পালং থানা হাজির হইয়া চাঁদাবাজ দ্বীন ইসলাম ব্যাপারীর বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করি। পশ্চিম কোটাপাড়া নদীর পাড় বাইতুন নুর জামে মসজিদ এর সভাপতি মোঃ রব ব্যাপারীর সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে তার কাছে মসজিদের নামে রশিদ বানিয়ে চাঁদা তোলার বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানিনা। মসজিদের নামে চাঁদা তোলেন এই মসজিদের ইমাম ও দিন ইসলাম বেপারী। তিনি আরো বলেন, মসজিদের নামে টাকা তুলে তারা খায় না মসজিদে দেয় সেটাও আমি জানি না। এ বিষয়ে দ্বীন ইসলামের কাছে হিসাব জানতে চাইলে বিগত দিনে আমার সাথে মনোমালিন্য হয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দিন ইসলাম বেপারী গণমাধ্যমকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন এই মসজিদের ক্যাশিয়ারের দায়িত্ব পালন করতেছি। আমি এবং ইমরান বেপারী এই মসজিদ কমিটির সদস্যদের হুকুমে মসজিদের উন্নয়নের জন্য মসজিদের রশিদ দিয়ে প্রত্যেক ট্রলার থেকে দেড় শত টাকা এবং বস্তাপ্রতি ২৫পয়সা করে আদায় করি। সিমেন্ট ব্যবসায়ী মোক্তার চৌকিদারের সাথে আমার মারামারি হয় ঘাট দিয়ে মাল নামানোর টাকা চাওয়ায়। সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মন্দীপ ঘড়াই গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগকারী আমাকে অবহিত করেনি। অভিযোগকারী উপজেলা বরাবর অভিযোগ করলে উক্ত অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
