সেনাবাহিনীতে চাকরি দেয়ার প্রতারক চক্রের ভূয়া মেজর গ্রেফতার ৩
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত : ০৮:০৭ পিএম, ২০ জানুয়ারি ২০১৯ রোববার
সেনাবাহিনীতে চাকরি দেয়ার নামে প্রতারক চক্রের ভূয়া মেজরসহ গ্রেফতার ৩
র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। বিভিন্ন ধরণের চাঞ্চল্যকর অপরাধের স¦রূপ উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আনার কারনেই এই প্রতিষ্ঠান মানুষের কাছে আস্থা ও নিরাপত্তার অন্য নাম হিসাবে গ্রহণ যোগ্যতা পেয়েছে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে অপরাধীরা নিত্য নতুন অপরাধ করছে তার মধ্যে প্রতারণা অন্যতম। বিভিন্ন প্রতারক চক্র নানা কৌশলে সাধারন মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজিকরে হাতিয়ে নিচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা ও সম্পত্তি।
প্রতারক চক্র তাদের উদ্দেশ্য সফল ও মানুষের কাছে বিশ্বাস যোগ্যতা অর্জনের জন্য বহুরূপী সাজে নিজেকে সাজিয়ে উপস্থাপন করে মানুষের সামনে। ইতিপূর্বে ভূয়া মেজর, ভূয়া ক্যাপ্টেন, ভূয়া ডিবি এবং পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তার নাম ও পদবী ব্যবহার করে প্রতারণার জন্য বিভিন্ন প্রতারককে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। সম্প্রতি বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে একটি প্রতারক চক্র বিভিন্ন অফিস, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ নানা জায়গায় চাকুরী দেয়ার জন্য একদিকে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয় এবং অন্যদিকে চাকুরী নিশ্চিত করার জন্য মেজর ও ক্যাপ্টেন পদমর্যদা ব্যবহার করে এমনভাবে সুপারিশ করে, তা জুনিয়র কিংবা অধঃস্তন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পক্ষে সে সুপারিশ মূল্যায়ন না করা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়। অনেক সময় নিন্ম বা মধ্যম পর্যায়ের পদবী যাদের কাছে সুপারিশ করা হয় তাদের ঐ অফিসে কিংবা পদবী নামের সত্যতা যাচাই করার মত সময় কিংবা সুযোগ থাকে না।
র্যাবের কাছে বেশ কিছু জায়গা থেকে এই ধরনের প্রতারণার কিছু তথ্য আসার পর র্যাব-২ এর একটি দল বিষয়টি নিয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করে। এরই প্রেক্ষিতে গতকাল ১৯ জানুয়ারি ২০১৯খ্রিঃ আনুমানিক ১৯.০৫ ঘটিকার সময় ঢাকা মহানগরীর আদাবর থানাধীন বাইতুল আমান হাউজিং সোসাইটি, রোড নং-১, বাসা নং-২৭৩/২৭৪ জারা টাওয়ার এর সামনে পাকা রাস্তার উপর হইতে ভূয়া মেজর পরিচয় দানকারী চক্রের অন্যতম হোতা ১। সৈয়দ আবু জাফর (৬১) কে আটক করা হয়। আটককৃত আসামী সৈয়দ আবু জাফর এর দেওয়া তথ্য মোতাবেক তার চক্রের অপর সদস্য ২। শিল্পী আক্তার (২৯)কে আটক করা হয় এবং মোঃ আতাউর রহমান খাঁনসহ ৩/৪ জন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আটককৃত এবং পলাতক আসামীরা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র। তারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার ভূয়া পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার লোকজনের নিকট হইতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং নৌ বাহিনীতে চাকুরী দেয়ার নামে প্রার্থীদের নিকট হতে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিত এবং পরবর্তীতে তাদেরকে চাকুরী না দিয়ে বিভিন্নভাবে প্রতারণা করে আসছিল। ধৃত আসামীদের’কে জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
সৈয়দ আবু জাফর (৬১) এই চক্রের প্রধান হোতা, সে এই চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করতো। সে নিজেকে সেনাবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত মেজর হিসাবে পরিচয় দিত। বিভিন্ন মানুষের কাছে সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত মেজর র্যাংক ব্যাজ সম্বলিত ছবি প্রদানের মাধ্যমে সে নিজেকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর হিসাবে উপস্থাপন করত। তার অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষ বিশ্বাস করতো যে সে সেনাবাহিনীর একজন অবসর প্রাপ্ত মেজর। সাধারন ছাত্র, বেকার যুবক, দরিদ্র ছাত্রদের সেনাবাহিনী এবং নৌ বাহিনীতে চাকুরী দেওয়ার কথাবলে ঢাকায় নিয়ে আসত। পরবর্তীতে চাকুরি প্রত্যাশীদের সেনানিবাস ও আশেপাশের এলাকায় গাড়ী দিয়ে ঘুরিয়ে আনত। কিছু ক্লিনিকে তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে বিষয়টিকে বিশ^াসযোগ্য করে তুলতো। অবশেষে সে তার চক্রের সহায়তায় চাকুরি প্রত্যাশীদের বিভিন্ন বাহিনীতে যোগদানের জন্য ভূয়া নিয়োগপত্র প্রদান করত। এতে তারা আশ^স্ত হয়ে বিপুল পরিমান টাকা এই ভূয়া মেজর ও তার চক্রকে প্রদান করত। সে মোঃ হাবিবুর রহমান সরদার ও মোঃ আজগর আলী নামের ০২(দুই) জনকে নৌ বাহিনীর ০২ টি ভূয়া নিয়োগপত্র দেয়। সে আরোও জানায় ১। মোঃ আবুল কালাম আজাদ(৩০), ২। মোঃ আলামিন(২১), ৩। মোহাঃ জিয়াউল হক(২১), ৪। মোঃ পলাশ(২০), ৫। মোহাঃ আব্দুর রহমান(২০), ৬। মোঃ আব্দুল আলিম(২১) দেরকে বাংলাদেশ সেনা বাহিনী ও নৌ বাহিনীতে চাকুরি দেওয়ার কথা বলে মোটা অংকের টাকা গ্রহন করেছে। সৈয়দ আবু জাফর ভূয়া মেজর পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হতে অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিত। তার এলাকার দারোয়ান থেকে ডিস ব্যবসায়ী পর্যন্ত সকলেই তাকে মেজর পরিচয়ে চিনত এবং সে তাদের উপর প্রভাব দেখাতো। শিল্পী আক্তার (২৯) এই চক্রের ২য় হোতা, তিনি সৈয়দ আবু জাফর এর ৩য় স্ত্রী। সে বিভিন্ন সময় সেনা বাহিনী ও নৌ বাহিনীতে ভর্তি ইচ্ছুক প্রার্থীদের নিকট হতে অবৈধ টাকা গ্রহন করিত এবং তার স্বামী সৈয়দ আবু জাফরকে সকল অবৈধ কাজে পূর্নাঙ্গ সহযোগিতা করত।
এই চক্রের অপর এক সদস্য মোঃ আতাউর রহমান খান(৫০)। সে মূলত রাজশাহী এলাকার সাধারন ছাত্র, বেকার যুবক, দরিদ্র ছাত্রদের সেনাবাহিনী এবং নৌ বাহিনীতে চাকুরী দেওয়ার কথাবলে মুল হোতা সৈয়দ আবু জাফরের নিকট নিয়ে আসত। পরবর্তীতে সেনা বাহিনী এবং নৌ বাহিনীতে বিভিন্ন পদে চাকুরী দেওয়ার প্রলোভন এবং ভূয়া নিয়োগপত্র দেখাত। তার মূল কাজ ছিল গ্রাম থেকে শহর মুখি ছাত্র, দারিদ্র ছাত্র, বেকার যুবকদের টার্গেট করে ভূয়া অবসর প্রাপ্ত মেজর সৈয়দ আবু জাফর এর পর্যন্ত আনা।
