শনিবার   ১৫ জুন ২০২৪   আষাঢ় ১ ১৪৩১   ০৮ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

মা হালিমার সংসারে সুদিন ফেরে যেভাবে

হাফেজ মাওলানা মুফতী শামীম আহমেদ

প্রকাশিত : ০৭:৫৪ পিএম, ৫ আগস্ট ২০২৩ শনিবার

প্রিয় নবীজি (সা.)-এর দুধ মা বিবি হালিমা সাদিয়া (রা.)। দারিদ্র্যের কশাঘাতে পিষ্ট এই মহীয়সী নারীর ঘর আলোকিত হয় নবীজি (সা.)-এর আগমনে। নবীজি (সা.)-এর আগমন উপলক্ষে মহান আল্লাহ তাঁদের এমন বরকত দিয়ে দিলেন যে তাঁদের আর কোনো অভাবই রইল না। ছোট একটা সঠিক সিদ্ধান্ত তাঁদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।

তা হলো, কোনো কিছু পাওয়ার আশা না করেই শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে দায়িত্ব নেওয়া।

মহান আল্লাহ সেদিন থেকেই তাঁকে সব ধরনের বরকত অনুভব করাতে লাগলেন। এ ব্যাপারে হালিমা (রা.) বলেন, ‘যখন আমি শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে নিজ আবাসনে ফিরে এলাম এবং তাঁকে আমার কোলে রাখলাম তখন তিনি তাঁর বক্ষ আমার বক্ষের সঙ্গে মিলিত করে পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে দুধ পান করলেন। তাঁর দুধভাই অর্থাৎ আমার গর্ভজাত সন্তানটিও পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে দুধ পান করল।

এরপর উভয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। এর আগে তার এভাবে ঘুম আমরা কখনোই দেখিনি।

অন্যদিকে আমার স্বামী উট দোহন করতে গিয়ে দেখেন যে তার ওলান দুধে পরিপূর্ণ আছে। তিনি এত বেশি পরিমাণে দুধ দোহন করলেন যে আমরা উভয়েই তৃপ্তির সঙ্গে পেট পুরে তা পান করলাম এবং বড় আরামের সঙ্গে রাত যাপন করলাম।

পূর্ণ পরিতৃপ্তির সঙ্গে রাত্রি যাপন শেষে যখন সকাল হলো তখন আমার স্বামী বললেন, ‘হালিমা (রা.), আল্লাহর শপথ, তুমি একজন মহা ভাগ্যবান সন্তান লাভ করেছ।’ জবাবে বললাম, ‘অবস্থা দেখে আমারও যেন তা-ই মনে হচ্ছে।’

হালিমা (রা.) আরো বলেন, মক্কায় যাওয়ার সময় আমার যে মাদী গাধাটি অত্যন্ত দুর্বল ছিল, ঠিকমতো হাঁটতেই পারছিল না, নবীজি (সা.)-কে নিয়ে রওনা দিলেই সে গাধাটিই কাফেলার সব প্রাণীর পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিল। অবশেষে আমি আমার বনু সাদ গোত্র নিজ বাড়িতে এসে উপস্থিত হই। এরই পূর্বে আমার জানা ছিল না যে আমাদের অঞ্চলের মানুষের চেয়ে অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষ অধিকতর অভাবগ্রস্ত ছিল কি না, কিন্তু মক্কা থেকে আমাদের ফিরে আসার পরবর্তী সময়ে আমাদের বকরিগুলো চারণভূমি থেকে খেয়ে পরিতৃপ্ত হয়ে দুগ্ধ পরিপূর্ণ ওলান সহকারে বাড়িতে ফিরে আসত।

দুগ্ধবতী বকরিগুলো দোহন করে আমরা তৃপ্তিসহকারে দুধ পান করতাম। অথচ অন্য লোকেরা দুধ পেত না এক ফোঁটাও। তাদের পশুগুলোর ওলানে কোনো দুধই থাকত না। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে পশুপালের মালিকরা তাদের রাখালদের বলতেন, ‘হতভাগারা যেখানে বনু জুওয়াইবের কন্যার রাখাল পশুপাল নিয়ে যায় তোমরা কি তোমাদের পশুপাল নিয়ে সেই চারণভূমিতে যেতে পার না?’

এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের রাখাল যে চারণভূমিতে পশুপাল নিয়ে যেত অন্যান্য লোকের রাখালরাও সেই ভূমিতে পশুপাল নিয়ে যেত। কিন্তু তা সত্ত্বেও তাদের পশুগুলো ক্ষুধার্ত ও অভুক্ত অবস্থায় ফিরে আসত। সেসব পশুর ওলানে দুধও থাকত না। অথচ আমাদের বকরিগুলো পরিতৃপ্তি এবং ওলানে পূর্ণমাত্রায় দুধসহকারে বাড়িতে ফিরত। প্রত্যেকটি কাজেকর্মে আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে সব কিছুর মধ্যেই আমরা বরকত লাভ করতে থাকলাম।

এভাবে সেই ছেলের পুরো দুটি বছর অতিবাহিত হয়ে গেল এবং আমি তাঁকে স্তন্য পান করানো বন্ধ করে দিলাম। অন্য শিশুদের তুলনায় এ শিশুটি এত সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে থাকলেন যে দুই বছর পুরো হতে না হতেই তাঁর দেহ বেশ শক্ত ও সুঠাম হয়ে গড়ে উঠল। লালন-পালনের মেয়াদ দুই বছর পূর্ণ হওয়ায় আমরা তাঁকে তাঁর মাতার কাছে নিয়ে গেলাম।

কিন্তু তাঁকে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে আমাদের সংসার জীবনে সচ্ছলতা ও বরকতের যে সুফল আমরা ভোগ করে আসছিলাম তাতে আমরা মনের কোণে একটি গোপন ইচ্ছা পোষণ করে আসছিলাম যে তিনি যেন আরো কিছুকাল আমাদের কাছে থাকেন। তাঁর মাতার কাছে আমাদের গোপন ইচ্ছা ব্যক্ত করে বললাম যে তাঁকে আরো কিছু সময় আমাদের সঙ্গে থাকতে দিন যাতে তিনি সুস্বাস্থ্য ও সুঠাম দেহের অধিকারী হয়ে ওঠেন। অধিকন্তু মক্কায় মহামারির প্রাদুর্ভাব সম্পর্কেও আমরা কিছুটা ভয় করছি। আমাদের বারংবার অনুরোধ ও আন্তরিকতায় আশ্বস্ত হয়ে তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে পুনরায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দান করলেন।

পরবর্তী সময়ে নবীজি (সা.)-এর বক্ষ বিদারণের ঘটনার পর হালিমা (রা.) নবীজি (সা.)-কে তাঁর মায়ের কাছে পৌঁছে দেন।