মঙ্গলবার   ০৫ জুলাই ২০২২   আষাঢ় ২০ ১৪২৯   ০৫ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৩

মোরেলগঞ্জে দীর্ঘ ২৫ বছর পর নিজ পরিবারে ফিরে এলেন নুপুর আক্তার 

মোরেলগঞ্জ বাগেরহাট

প্রকাশিত : ০৪:২১ পিএম, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২ সোমবার

অবশেষে দীর্ঘ ২৫ বছর পর নিজ পরিবারের সাথে মিলিত হলেন নুপুর আক্তার (৩২)।   আজ থেকে ২৫ বছর পূর্বে  মাত্র ৭ বছর বয়সে বাবা হাফেজ নুরুল হক ফকিরের ভয়ে বাড়ি থেকে নানাবাড়ি এসে  বাজারে ঘুরতে যায় নুপুর। বাজারের লঞ্চ টার্মিনালে লঞ্চ দেখতে দেখতে লঞ্চের ভিতরে প্রবেশ করে সে। আর তখনই লঞ্চটি ছেড়ে দেয়। ফিরে আসবে ভেবে কাউকে কিছু বলেনি নুপুর৷ পরদিন ঢাকা সদরঘাটে পৌঁছায় সে। এখানে নেমে ঢাকার নাম শুনে বাড়ি ফিরতে আবার লঞ্চ উঠে নুপুর।

তবে এবার ভুল লঞ্চে উঠে নামে সে ভোলার চরফ্যাশনে। এভাবেই  হারিয়ে যায় সে। পরিবারের লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করে পায়নি তাকে।  অবশেষে গত ২২ ফেব্রুয়ারি দীর্ঘ  ২৫ বছর পর স্বামী- সন্তান নিয়ে নিজ জন্মস্থান আর পরিবারের কাছে বাড়িতে হাজির নুপুর। নিখোঁজের এতোদিন পর ঘরে ফেরায় তার পরিবার ও প্রতিবেশীরা আনন্দের জোয়ারে ভাসছে।

খবর পেয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার খাউলিয়া  ইউনিয়নের পূর্ব চিপাবারইখালী গ্রামের হাফেজ নুরুল হক ফকিরের বাড়িতে এমনই আনন্দের  বন্যা। 

নুপুরের বাবা বয়োবৃদ্ধ নুরুল হকের বাড়িতে নুপুরের মা, ৪ ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তানেরা, অন্য ৩ বোন-ভগ্নিপতি এবং তাদের সন্তানেরা নুপুরের স্বামী মাহবুবুর রহমান,দুই ছেলে আদনান (৯) ও আরিয়ান (২) সহ বহু আত্মীয় স্বজনের এক মেলা বসে। নুপুর আর তার স্বামী-সন্তানকে বরণ করে নেন সবাই। ৮ ভাই-বোনের মধ্যে  নুপুর ষষ্ঠ।

নুপুরের পরিবার জানায়, আজ থেকে ২৫ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৯৯৭ সালে বাবার বকাঝকার ভয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান নুপুর। গ্রামের সহজ সরল ৭ বছর বয়সের সেই নুপুর পথ হারিয়ে ওঠেন ভোলা জেলার চরফ্যাসনে। সেখানে তাকে পথে বসে কান্নারত দেখতে পেয়ে মধ্যবয়সী একজন নিয়ে তার বাড়ি আশ্রয় দান করেন। পরে কন্যা সন্তানপ্রেমী এক দম্পতি নুপুরকে নিজেদের মেয়ে হিসেবে  সেখান থেকে গ্রহণ করে। পরবর্তীতে এ দম্পতিই তাকে নিজ কন্যার মতো লালন-পালন করতে থাকেন,শিখিয়েছেন  লেখাপড়া, দিয়েছেন বিয়ে।

 আজ সেই নুপুর আক্তার মাদ্রাসা থেকে কামিল পাস করেছেন। স্বামী মাহবুবুর রহমান ঢাকায়  একটি কোম্পানির চাকরি করেন। তাদের ঘরে রয়েছে আদনান(৯) ও আরিয়ান (২) নামে দুটি ছেলে। পালক বাবা-মা, ভাই  এবং  পরবর্তীতে স্বামী- সন্তান নিয়ে সুখেই ছিলেন নুপুর। কিন্তু রক্তের টানে পরিবারের সন্ধানে সর্বদাই তিনি বিষন্ন থাকতেন। তার শশুরবাড়ির লোকেরা নুপুরের এ বিষন্নতা লক্ষ্য করতেন। পরে স্বামীর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ' আপন ঠিকানা'র আরজে কিবরিয়ার সাথে যোগাযোগ করে তার স্টুডিওতে নুপুরের হারিয়ে যাওয়ার  গল্প প্রচার করা হয়। সবকিছু মিলে গেলে নুপুরের পরিবার আরজে কিবরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে। এভাবেই নুপুর ২৫ বছর পর  তার নিজ পরিবার ফিরে পান। 

গত ২২ ফেব্রুয়ারি মোরেলগঞ্জে তার বাবার বাড়িতে আসার পর তিনি তার স্বামী সন্তান নিয়ে বেড়িয়ে চলেছেন বিভিন্ন  আত্মীয়ের  বাড়িতে। বর্তমানে (২৭ ফেব্রুয়ারি) তিনি পূর্ব চিপাবারইখালীতে তার মেঝ বোনের বাড়িতে বেড়াচ্ছেন। 

   তার মেঝ দুলাভাই আব্দুল কাদের জানান, আমরা শশুর বাড়িতে গিয়ে শুনতাম যে, তাদের সেঝ মেয়ে নুপুর হারিয়ে গেছে। এখন তাকে ফিরে পেয়ে সবাই খুশি।  তাকে লালন-পালন করা  বাবা- মায়ের প্রতি অত্যন্ত  কৃতজ্ঞচিত্তে বলতে চাই - তাদের মত মানুষ বিরল। তারা নুপুরকে মানুষের মত মানুষ বানিয়েছেন। লেখাপড়া শিখিয়েছেন, বিয়ে দিয়েছেন। 

তবে নুপুর আক্তার মিডিয়ার সামনে কোন কথা বলতে রাজি হননি।