বৃহস্পতিবার   ৩০ জুন ২০২২   আষাঢ় ১৭ ১৪২৯   ৩০ জ্বিলকদ ১৪৪৩

তরুণ কণ্ঠ|Torunkantho
৫৬

ফিরে আসতে চায় ওরাও

নিজস্ব প্রতিবেদক  

প্রকাশিত: ২৪ মে ২০২২  

প্রতি বছরই নানা প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে ভারতে পাচার হচ্ছেন অসংখ্য তরুণী। অভাবে, উচ্চাভিলাষে উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ভারতে গিয়ে অমানবিক জীবনের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। প্রায়শই তাদের ওপর নেমে আসছে নির্মম নির্যাতন। নির্যাতন সইতে না পেরে এক সময়ে বাধ্য হয়ে হোটেল, ম্যাসাজ পার্লার ও বিভিন্ন বাসায় অনৈতিক কাজে জড়াতে হচ্ছে তাদের। নিপীড়নের শিকার অনেকে আবার নিপীড়কের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হচ্ছেন।

অনেকে নিজের সর্বনাশা পরিণতি যাতে বরণ করতে না হয়-সেজন্য সদ্য পাচার হওয়া তরুণীদের পালাতে সাহায্য করেছেন। যাদের ওপরেও পরে নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করে সেসবের ভিডিও ধারণ করে রাখে চক্রের সদস্যরা। এভাবে একবার চক্রের ফাঁদে পড়ে ‘জাহান্নামের জীবন’ বরণ করতে হচ্ছে পাচারের শিকার তরুণীদের। কিন্তু তারা সব সময় স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন দেখছেন দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে নতুন জীবন শুরুর। টিকটক চক্রের মাধ্যমে ভারতে পাচার হওয়া তরুণীরা দেশে ফিরে এমন তথ্যই জানিয়েছেন।

শনিবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বেঙ্গালুরুতে পাচার ও যৌন সহিংসতার শিকার বাংলাদেশি এক তরুণীকে হস্তান্তর করে। এছাড়া পাচারের শিকার আরও তিন তরুণীকে ফিরিয়ে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গত বছরের মাঝামাঝিতে বেঙ্গালুরুতে নৃশংস নির্যাতনের শিকার হন ওই তরুণী। নিপীড়নের সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনার পর দেশে ও ভারতে গ্রেফতার হন চক্রের ৩২ জন। এদের মধ্যে বাংলাদেশে গ্রেফতার হন ২০ জন। রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে ছয়টি মামলা করা হয়। যাদের মধ্যে ভারতে পাচার হয়ে ফিরে আসা ভুক্তভোগীও রয়েছেন। নির্যাতনের শিকার তরুণীদের সঙ্গে ভারতের দিনগুলোর বিষয়ে কথা হয় যুগান্তরের। সেখানে উঠে আসে সেই সময়ের অবর্ণনীয় নির্যাতনের বর্ণনা। তাদের আক্ষেপ ছিল-‘অন্যরাও যদি দেশে ফিরে আসতে পারত!’ পুলিশ এখন দেশীয় চক্র শনাক্তসহ পাচার হওয়া তরুণীদের ফেরাতে কাজ করছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার যুগান্তরকে বলেন, নির্যাতনের শিকার ওই তরুণীকে সব ধরনের সহায়তা করা হচ্ছে। তাকে মঙ্গলবার আদালতে নেওয়া হবে।

ওই তরুণী এখনো মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাবা-মাকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছেন। ফিরে আসাকে ‘নতুন জীবন’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি মানব পাচার চক্রের সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী মানব পাচারের সিন্ডিকেট নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য এসেছে তার কথায়। যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগ্রহ করে রাখা তরুণীদের ভারতে পাচারের সব আয়োজন করে রাখে। বিশেষ করে খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর ও নড়াইল জেলার চক্রের অনেক সদস্যের কথা উঠে এসেছে তার বর্ণনায়। সেই অনুযায়ী মানব পাচার চক্রের মূল হোতাদের ধরতে কাজ করছে পুলিশ।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. আশিক হাসান যুগান্তরকে বলেন, গত বছর নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হওয়া ওই তরুণী এখনো ট্রমাটাইজড। যদিও দেশে আসার আগে ভারতের সেফ হোমে থাকায় তার মানসিক অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে থাকা মেয়েটির মা-বাবা তার সঙ্গে রয়েছেন। সোমবার তার শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। গত বছর তরুণীকে নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর হাতিরঝিল থানায় এ সংক্রান্ত ছয়টি মামলা হয়। সেখানে টিকটক হৃদয়সহ যাদের নাম এসেছে, যেসব অভিযোগ এসেছে সেসব বিষয়েও তার থেকে তথ্য জানতে চাওয়া হবে। এরপর আদালতের মাধ্যমে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। তরুণীর থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে পুলিশ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ভারতে এখনও এমন অনেক তরুণী অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে আছেন বলেও জানান ভুক্তভোগী তরুণী। তিনি জানিয়েছেন, পার্লারে চাকরির কথা বলে টিকটক হৃদয় বাবুর চক্র তাকে ভারতে পাচার করে। সেখানে পরিবারের অসম্মতিতেই ভালো জীবনের আশায় ভারতে গিয়েছিলেন। বেনাপোল দিয়ে তাকে পাচার করা হয়। এরপর বেঙ্গালুরুতে নিয়ে একটি বাসায় রাখা হয়। সেখান থেকে সপ্তাহ খানেকের বেশি সময় পর তাকে একটি হোটেলে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পালালে তাকে আরেক জায়গায় নিয়ে তার ওপর বীভৎস নির্যাতন চালানো হয়। অভিযোগ আনা হয়, পাচার করে আনা তরুণীদের পালাতে তিনি সহায়তা করেছেন। ভারতে পাচার হওয়া তরুণীরা দেশে ফিরতে চান বলেও জানান তিনি।

এদিকে নির্যাতনের শিকার আরেক তরুণী ভারত থেকে ফিরে যুগান্তরকে বলেন, টিকটকার হৃদয় বাবুর মাধ্যমে তিনি পাচার হয়েছেন। ঢাকা থেকে বেনাপোল যাওয়ার পর তরিকুল নামে একজন তাকে রিসিভ করে। এরপর রাতে সীমান্তবর্তী আল-আমিন নামের একজনের বাসায় ছিলেন। সেখান থেকে আব্দুল হাই সবুজ, আমিরুল ও সাইফুলের কাছে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ভারতে পাচার করে একটি কক্ষে আটকে অশ্লীল ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করা হয়। এরপর সেই ভিডিওর ভয় দেখিয়ে দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে দুই লাখ টাকা নেয় পাচার চক্র। এই তরুণী জানান, ভারতের বিভিন্ন হোটেলে এমন অসংখ্য তরুণী আছেন। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও তা থামেনি। এখনও চলছে।

ভারত ফেরত অপর দুই তরুণীর সঙ্গেও কথা হয় যুগান্তরের। তারা জানান, পাচারের পর এমনভাবে যৌন নিপীড়ন চলতে থাকে, একপর্যায়ে তারা মৃত্যুশয্যায় পতিত হন, গর্ভবতী হয়ে পড়েন। পরে সন্তান নষ্ট করেও চলে নির্যাতন। বিবস্ত্র করে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে রাখে পাচার চক্রের সদস্যরা। ফলে অনেক মেয়ে সেখানে আটকা থাকলেও ফেরার উপায় নেই। তবে এই জীবন থেকে সবাই ফিরতে চান। নির্যাতনের শিকার আরেক তরুণীর বাবা যুগান্তরকে বলেন, ভারতে যারা পাচার হয়েছেন ও ফিরেছেন তাদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি আমার মেয়েও সেখানে রয়েছে। সেখানে তাকে মারধর করে জোরপূর্বক বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, ম্যাসাজ পার্লার ও বাসায় পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা হয়েছে। এখনও আমার মেয়ের সন্ধান পাইনি।

এই বিভাগের আরো খবর